ইরানকে ঠেকাতে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিই বদলে ফেললেন ট্রাম্প?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৮, | ২০:৪৪:৫৫ |

ইরান যুদ্ধের জের ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া এবং ওমানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারদের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের এই কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি ও আকস্মিক নীতি পরিবর্তন বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক পরামর্শ বা পেশাদার সম্পর্কের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও তাৎক্ষণিক আবেগের ওপর ভিত্তি করে নীতি নির্ধারণ করছেন, যা মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সংকট তৈরি করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ও কৌশলগত জটিলতার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নির্ধারিত বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ব্যাপকভাবে কমানোর জন্য পেন্টাগনকে নির্দেশ দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথমহড়ার ব্যাপ্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর নির্দেশ দেন। 

ট্রাম্পের দাবি, এ ধরনের যৌথ যুদ্ধাভ্যাস অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং তা উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রতি একটি অনুচিত ও শত্রুভাবাপন্ন বার্তা পাঠায়। অথচ উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতেই ওয়াশিংটন ও সিউলের মধ্যে কয়েক দশক ধরে এই যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে কোরীয় উপদ্বীপে দক্ষিণ কোরিয়াকে সাহায্য করার প্রয়োজনীয়তা তিনি দেখছেন না, বিশেষ করে সিউল যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণ বা সহায়তা করতে অস্বীকার করেছে। তিনি কিম জং উনের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ভালো সম্পর্কের দোহাই দিয়ে দীর্ঘদিনের সামরিক চুক্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাইপার্টিসান রাজনৈতিক অঙ্গন এবং এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর মধ্যে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। 

ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের বিশ্লেষকরাই সতর্ক করে বলছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে এশীয় অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতি ও দায়বদ্ধতা দুর্বল হয়ে পড়বে, যা সার্বিক ভূ-রাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার অবশ্য ট্রাম্পের এই আকস্মিক পদক্ষেপে অত্যন্ত মেপে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার সম্পর্ক আলোচনার পথ তৈরি করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্র ও মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প ভয়াবহ সামরিক হুমকির বার্তা দিয়েছেন। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সংকট নিরসনে ওমান যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছিল, তখন ট্রাম্প সরাসরি মন্তব্য করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তির মাঝে ওমান যদি কোনো ধরনের বাধা তৈরি করে, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ওমানে কঠোর বোমা হামলা চালাবে। হরমুজ প্রণালীর একপাশে ইরান এবং অপরপাশে ওমান অবস্থিত হওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছিল। ট্রাম্পের মতে, ওমানের নিজস্ব উদ্যোগ মার্কিন কৌশলের পরিপন্থী হতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষায় ওমানের দীর্ঘদিনের বিমান ও নৌঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও ট্রাম্পের এই সরাসরি বোমাহামলার হুমকি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা নীতিকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এসব ঘটনা ট্রাম্পের বহুল আলোচিত অপ্রত্যাশিত বৈদেশিক নীতি এবং আমেরিকা ফার্স্ট কৌশলেরই বহিঃপ্রকাশ। ট্রাম্প ঐতিহ্যগত বৈশ্বিক সামরিক জোট বা বহুপক্ষীয় সম্পর্কগুলোকে মার্কিন জাতীয় শক্তির অংশ হিসেবে দেখার পরিবর্তে একটি ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে বিবেচনা করছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ধরনের একমুখী ও ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের ফলে ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। বহু ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্র দেশ এখন আমেরিকার অপ্রত্যাশিত মন্তব্য ও নীতি সামাল দিতে প্রকাশ্য সংঘাত এড়িয়ে নীরবতা ও নিজস্ব বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার পথ বেছে নিচ্ছে।

সূত্র: এনডিটিভি

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..