✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৭, | ১১:২৮:২১ |ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই এই সমুদ্রপথকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন তিনি। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রেসিডেন্টের একতরফা ঘোষণায় কোনো ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হয়ে যায় না। ফলে ট্রাম্পের এমন ঘোষণা বাস্তবে কার্যকর করার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশ্লেষণধর্মী এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি নিয়ে সামরিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যেই গত শুক্রবার প্রণালিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার কথা জানান ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইরান। একই সময়ে গত জুনে দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের মেয়াদও রোববার শেষ হওয়ার কথা। সংঘাত শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রেখেছে ইরান। এর জবাবে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রও নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। এতে তেহরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
কে আগে পিছু হটবে—এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানকে নিয়ে ট্রাম্পের সামরিক হুমকি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর বিভিন্ন সময়ে ইরানে হামলার হুমকি দিলেও শেষ মুহূর্তে সরে এসেছেন তিনি। ইরানের সঙ্গে আলোচনাকে ট্রাম্প ‘দাবা খেলার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।
গত শুক্রবার নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করবেন। নৌ অবরোধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি এমন দাবিও করেন যে, প্রণালিটি ইতোমধ্যেই কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, ‘মূলত এটাই তো হচ্ছে। আমাদের অবরোধ রয়েছে। আমরা না চাইলে কোনো জাহাজই সেখান দিয়ে যেতে পারবে না।’
তবে ইরানের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ আরোপের কথা বলছে, সামুদ্রিক চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, কিছু জাহাজ এখনও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে।
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার কিম্বার্লি হালকেটের ভাষ্য, ট্রাম্প বক্তব্য দেওয়ার সময় হাসছিলেন। তার মতে, এতে ধারণা করা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়তো বিষয়টি পুরোপুরি আক্ষরিক অর্থে তুলে ধরেননি। হালকেট বলেন, হরমুজ প্রণালির কর্তৃত্ব ইরান ও ওমানের। তবে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকেন এবং এবারও তার লক্ষ্য ইরান।
তবে তার বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কার্যকর রয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তা। দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অপরাধী ও ‘বুদ্ধিহীন’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অর্থহীন’ আখ্যা দিয়ে হরমুজ প্রণালি ইরানের বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদিও বলেন, টুইট, বিমানবাহী রণতরী, কোনো আদেশ কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দখল করা সম্ভব নয়। তার দাবি, হরমুজ প্রণালি ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে। প্রণালিটি কখন বন্ধ বা খোলা হবে, সেটিও ইরানই সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান তিনি।
এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সঙ্গেও আলোচনা করছে ইরান। প্রণালিটির অপর উপকূলীয় দেশ ওমান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তেহরান ও মাসকাটের আলোচনা শিগগিরই শেষ হতে পারে।
তবে প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টি আলাদা বলে জানিয়েছেন আরাগচি। তার মতে, এ ক্ষেত্রে গত জুনের সমঝোতা স্মারকে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে নৌ অবরোধ ও ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে।
অর্থাৎ, চলমান যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এসব ছাড় চাচ্ছে ইরান। যুদ্ধ শেষ করার শর্ত হিসেবেও শুরুতে তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে এসব বিষয় ছিল।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্টের একতরফা ঘোষণায় কোনো ভূখণ্ডের মালিকানা পরিবর্তন করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সময়ের সহকারী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রুস ফেইনের মতে, মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী ট্রাম্প এককভাবে কোনো ভূখণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করতে পারেন না।
তার ভাষ্য, কোনো ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করতে সিনেট অনুমোদিত চুক্তি অথবা কংগ্রেসের আইন প্রয়োজন। লুইজিয়ানা ক্রয়, হাওয়াই ও পানামা খাল যুক্তরাষ্ট্রের অধিভুক্ত করা এবং স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের পর পুয়ের্তো রিকো ও ফিলিপাইন অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও এ ধরনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল।
ফেইনের মতে, ট্রাম্প যদি হরমুজ প্রণালি দখল করে সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার চেষ্টা করেন, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের আওতায় সেটি ‘আগ্রাসী যুদ্ধের অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সিডনির নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী ডিন নাটালি ক্লেইনও মনে করেন, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের দাবির বাস্তব ভিত্তি তৈরি করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রণালিটির ওপর দখলদার শক্তি হিসেবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইরান অথবা অন্তত দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ব্যাপক জনসমর্থন নেই। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দল কংগ্রেসে অল্প ব্যবধানে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।
এদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুতও কমে আসছে বলে দেশটির কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরও রয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও। দেশটিতে পেট্রোলের গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৪ ডলারের বেশি হয়েছে, যা মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছিলেন, যুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম অগ্রাধিকার হলো পেট্রোলের বাড়তে থাকা দাম নিয়ন্ত্রণ করা। আর ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেটি দ্বিতীয় অগ্রাধিকার।
ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি প্রতিবেশী দেশেও হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে আঞ্চলিক দেশগুলোকে ব্যবহার করে আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে তেহরান।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে পুরো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একক সার্বভৌমত্ব নেই। জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন বা ইউএনসিএলওএস অনুযায়ী, উপকূলীয় দেশগুলো তাদের আঞ্চলিক জলসীমার ওপর সার্বভৌম অধিকার রাখে। এই জলসীমা উপকূল থেকে সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ২২ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালির দুই পাশে রয়েছে ইরান ও ওমানের উপকূল। সবচেয়ে সরু অংশে প্রণালিটির প্রস্থ প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল বা ৩৯ কিলোমিটার। ফলে ওই এলাকায় দুই দেশের ১২ নটিক্যাল মাইল করে আঞ্চলিক জলসীমা পরস্পরের ওপর এসে পড়ে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনে এই ধরনের জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের অধিকারও স্বীকৃত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—কোনো দেশই ইউএনসিএলওএস অনুমোদন করেনি। তবে আন্তর্জাতিক প্রণালি ও সমুদ্র চলাচলসংক্রান্ত কনভেনশনের বিভিন্ন নিয়মকে আন্তর্জাতিক রীতিনীতির অংশ হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেন, ট্রাম্প এ ধরনের বক্তব্য সাধারণত মার্কিন জনগণ, বিশেষ করে তার সমর্থকদের উদ্দেশে দিয়ে থাকেন। তার মতে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েলিটি টেলিভিশন সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে উঠে আসা একজন ‘শোম্যান’। তাই তার বক্তব্যকে কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন হলেও সব সময় আক্ষরিক অর্থে নেওয়া উচিত নয়।
মাসগ্রেভের মতে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বাস্তবতা ও আইন—দুই দিক থেকেই তা অত্যন্ত জটিল এবং কার্যত অসম্ভব। তবে তার বক্তব্য থেকে এটুকু স্পষ্ট যে, কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধে ইরানের কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে পিছু হটার কোনো ইঙ্গিত এখনও দিচ্ছেন না ট্রাম্প।