চরম মূল্য দিচ্ছে হিজবুল্লাহ!

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-০৩, | ২১:০৭:৩৯ |

গত ২ মার্চ ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর হিজবুল্লাহকে এখন চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের একটি বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছে এবং সেখানে একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। এই যুদ্ধের ফলে কয়েক হাজার হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন এবং কয়েক লাখ শিয়া ধর্মাবলম্বী মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।

হিজবুল্লাহর ভেতরের সূত্রগুলো জানিয়েছে, যোদ্ধাদের নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজার হতে পারে, যা আগে কখনও জনসমক্ষে আসেনি। এর ফলে লেবাননের ভেতরে হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক অবস্থান বেশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। দেশটির বিরোধী দলগুলো এখন সশস্ত্র দল হিসেবে হিজবুল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে কঠোর সমালোচনা করছে। তারা মনে করছে, হিজবুল্লাহর কারণেই লেবাননকে বারবার ইসরায়েলের সঙ্গে ভয়াবহ যুদ্ধে জড়াতে হচ্ছে।

গত এপ্রিল মাসে লেবানন সরকার কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছে। হিজবুল্লাহ এই বৈঠকের তীব্র বিরোধিতা করলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে হিজবুল্লাহর এক ডজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা এখন ইরানকে সঙ্গে নিয়ে এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন।

হিজবুল্লাহ মূলত ১৯৮২ সালে ইরানের বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীর হাত ধরে গঠিত হয়েছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়, তার দুদিন পরেই হিজবুল্লাহ পাল্টা হামলা শুরু করে। হিজবুল্লাহর পরিকল্পনা হলো, এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দর কষাকষিতে লেবানন ইস্যুটিকে অন্তর্ভুক্ত করা। তারা মনে করছে, ইরানের চাপের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে আরও শক্তিশালী কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি করা সম্ভব হবে।

এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে হওয়া সংঘাতে হিজবুল্লাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই যুদ্ধে হিজবুল্লাহর নেতা হাসান নাসরুল্লাহ নিহত হন এবং তাদের প্রায় পাঁচ হাজার যোদ্ধা প্রাণ হারান। গত ১৫ মাস মোটামুটি শান্ত থাকার পর হিজবুল্লাহ আবারও ড্রোন এবং নতুন যুদ্ধকৌশল নিয়ে মাঠে নামে, যা ইসরায়েলকে অবাক করে দিয়েছে। হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য ইব্রাহিম আল-মুসাভি বলেন, তারা ইরানের কথায় যুদ্ধ করছেন না।

বরং ইসরায়েল যেভাবে বারবার তাদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছিল, সেই 'অভিশপ্ত চক্র' ভাঙার জন্যই তারা এই যুদ্ধ শুরু করেছেন। তিনি স্বীকার করেন যে, দক্ষিণ লেবাননে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে প্রাণের হিসাব করা যায় না।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত ২,৬০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে অন্তত এক-পঞ্চমাংশ নারী, শিশু ও স্বাস্থ্যকর্মী। তবে এই তালিকায় হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের সঠিক সংখ্যা নেই। হিজবুল্লাহর একজন কমান্ডার জানান, বিনত জেবিল এবং খিয়াম এলাকায় তাদের যোদ্ধারা আমৃত্যু লড়াই করেছেন এবং তাদের অনেকের মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বৈরুতের শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় গত কয়েক দিনে অনেক নতুন কবর তৈরি করা হয়েছে, যেখানে একের পর এক যোদ্ধাদের সমাহিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল দাবি করেছে তারা উত্তর ইসরায়েলকে নিরাপদ রাখতে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংস করছে। যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৭ জন ইসরায়েলি সেনা এবং ২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে, হিজবুল্লাহর এই যুদ্ধ মূলত টিকে থাকার একটি বড় বাজি। তারা চাইছে আঞ্চলিক সংকটের সমাধানের অংশ হতে। তবে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলে সেখানে লেবানন ইস্যু রাখা হবে না।

এদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, হিজবুল্লাহকে অবশ্যই নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে। কিন্তু হিজবুল্লাহ এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। লেবাননের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাদের শান্তিপূর্ণভাবে অস্ত্র জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে হিজবুল্লাহ এখন একদিকে ইসরায়েলি হামলা এবং অন্যদিকে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপের মুখে এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..