জার্মানি থেকে সেনা সরানোর প্রভাব যা হতে পারে

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-০৩, | ২০:৫৫:৪৯ |

জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার সেনা সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সেনা কমানোর সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ হলো ইরান সংঘাত নিয়ে মতবিরোধ। মার্কিন কর্মকর্তারা জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডেরিখে মার্জের সমালোচনাকে ‘অযৌক্তিক এবং সহায়ক নয়’ বলে অভিহিত করেছেন।

পেন্টাগন ঘোষণা দিয়েছে যে আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে জার্মানি থেকে একটি কমব্যাট ব্রিগেড সরিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি দূরপাল্লার ফায়ারস ব্যাটালিয়ন মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে।

শুধু সেনা কমানো নয়, উত্তেজনা আরও বেড়েছে বাণিজ্য বিরোধের কারণে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের গাড়ির ওপর নতুন করে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের ফলে ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি ২০২২ সালের আগের অবস্থার দিকে ফিরে যাচ্ছে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি জার্মানির ওপর নিরাপত্তা ঘাটতি পূরণের চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি চাপের মুখে পড়ছে অর্থনীতিও।

ইউরোপীয় নেতারা যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমেই অনির্ভরযোগ্য মনে করছেন। আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপের ফলে ইউরোপ নিজেদের স্বাধীন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধির দিকে এগোবে। এই পদক্ষেপ যে আসতে পারে তা ওই অঞ্চলের অনেকেই আগেই অনুমান করেছিলেন। এটি মূলত পরিবর্তিত ভূরাজনীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নিরাপত্তানীতির সরাসরি ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মোট সেনাসংখ্যা ও ঘাঁটি
জার্মানিতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৩৯ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এর পাশাপাশি আরও অন্তত ১০ হাজার সামরিককর্মী রয়েছে। তারা দেশজুড়ে ২০টি বড় ঘাঁটিতে ছড়িয়ে আছে, যেগুলো প্রধানত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। ছোট স্থাপনাসহ প্রায় ৪০টি মার্কিন পরিচালিত সামরিক স্থাপনা জার্মানিতে রয়েছে।

রামস্টাইন বিমানঘাঁটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। এটি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও পূর্ব ইউরোপে পাঠানো সেনা, সরঞ্জাম ও মালামালের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব হিসেবে কাজ করে। রামস্টাইন ইউরোপে মার্কিন বিমানবাহিনীর সদর দপ্তর এবং ন্যাটোর ইউরোপীয় আকাশসীমা নজরদারির কমান্ড সেন্টার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এখানে একটি স্যাটেলাইট রিলে স্টেশন রয়েছে, যা বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ড্রোন অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর বক্রতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি ড্রোন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাই রামস্টাইনের মাধ্যমে সিগন্যাল পাঠানো হয়।

এ ছাড়া এটি একটি চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। ইউরোপ, আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যে আহত সেনাদের এখানে আনা হয় এবং পাশের ল্যান্ডসটাল আঞ্চলিক চিকিৎসাকেন্দ্রে সেবা দেওয়া হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সবচেয়ে বড় সামরিক হাসপাতাল। এই দুই স্থাপনা কাইজেরস্লটার্ন সামরিক কমিউনিটির অংশ, যেখানে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা, বেসামরিক কর্মী ও তাদের পরিবার বসবাস করে।

স্প্যাংডাহলেম বিমানঘাঁটি জার্মানিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম মার্কিন বিমানঘাঁটি, যা রামস্টাইনের প্রায় ১২০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। এটি মূলত যুদ্ধ পরিচালনামূলক মিশনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানে প্রায় ২০টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমানসহ একটি স্কোয়াড্রন রয়েছে, যা সংকটকালে দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনী হিসেবে কাজ করে এবং ন্যাটোর পূর্বাঞ্চল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

স্টুটগার্ট ও ভিসবাদেনেও মার্কিন সেনা রয়েছে। সেটি তুলনামূলকভাবে কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। স্টুটগার্টে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় কমান্ড (ইইউকম) ও আফ্রিকা কমান্ড (আফ্রিকম) অবস্থিত, সেখান থেকে ইউরোপ ও আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ভিসবাদেন থেকেই ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সমন্বয় করা হয়।

গ্রাফেনভোর ও হোহেনফেলস ইউরোপে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এখানে বাস্তব গুলি ব্যবহার করে অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং কৃত্রিম গ্রাম তৈরি করে বাস্তবসম্মত যুদ্ধ অনুশীলন করানো হয়। প্রতিবছর হাজার হাজার ন্যাটো সেনা এখানে প্রশিক্ষণ নেয়।

বুচেল সামরিক ঘাঁটিকে জার্মানির একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে মনে করা হয়, যদিও এটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ন্যাটোর ‘নিউক্লিয়ার শেয়ারিং’ ব্যবস্থার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে অস্ত্র সংরক্ষণ করে, আর প্রয়োজনে মিত্র দেশগুলো তা ব্যবহার করে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, বুচেল ঘাঁটিতে ১৫ থেকে ২০টি কৌশলগত পারমাণবিক বোমা থাকতে পারে।

কেন এত মার্কিন ঘাঁটি?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির পরাজয়ের পর দেশটি মিত্রশক্তির মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। পশ্চিম জার্মানি যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

পরবর্তী সময়ে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হলে পশ্চিম জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে একটি সামনের সারির রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সেই সময় মার্কিন সেনা উপস্থিতি দ্রুত বাড়ানো হয় এবং ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তা আড়াই লাখেরও বেশি পৌঁছে যায়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও জার্মানির ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ থেকে যায়। তাই মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় সামরিক অভিযান এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চল সুরক্ষায় এসব ঘাঁটি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে, যদিও সেনাসংখ্যা ধীরে ধীরে কমেছে।

জার্মানির অর্থনীতিতে গুরুত্ব
এই সামরিক ঘাঁটিগুলো জার্মানির অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এগুলো বড় বিনিয়োগকারী ও নিয়োগকর্তা হিসেবে কাজ করে। ১০ হাজারের বেশি জার্মান সরাসরি মার্কিন বাহিনীর জন্য কাজ করেন এবং প্রায় ৭০ হাজার চাকরি পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে যুক্ত।

প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র এসব ঘাঁটির পরিচালনা, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। এ ছাড়া মার্কিন সেনা ও তাদের পরিবার স্থানীয় বাজারে ব্যয় করে, যা আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরোর সমপরিমাণ অবদান রাখে। সূত্র: বিবিসি, ডয়চে ভেলে

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..