✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-০৩, | ২১:০০:৪৭ |জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাদানুবাদের মধ্যে জার্মানি থেকে ৫,০০০ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পেন্টাগনের সিদ্ধান্তে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্পের দলের আইনপ্রণেতারা।
পেন্টাগনের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার এবং প্রতিনিধি পরিষদের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান মাইক রজার্স এক যৌথ বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন দল রিপাবলিকানের এই দুই এমপি বলেন, এই সেনা প্রত্যাহার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ভুল বার্তা দেবে এবং ইউরোপে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রভাব কমিয়ে দেবে। তাদের মতে, এই ৫,০০০ সেনাকে সরিয়ে না এনে বরং আরও পূর্ব দিকে রাশিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি মোতায়েন করা উচিত।
বর্তমানে জার্মানিতে ৩৬,০০০-এর বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। তবে শনিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, সেনার সংখ্যা আরও কমানো হতে পারে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইতালি এবং স্পেন থেকেও সেনা সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। এর আগে গত বছর রোমানিয়া থেকেও সেনা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ওয়াশিংটন। ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হলো ইউরোপ থেকে মনোযোগ কমিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে নজর দেওয়া।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ হবে। তিনি একে ‘কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে ডেমোক্র্যাট নেতা অ্যাডাম স্মিথ এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, এটি কোনো জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ নয়, বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ’। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রতিনিধি ক্লে হিগিন্স এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে জার্মানির কড়া সমালোচনা করেছেন।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মার্জ সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ‘লজ্জিত’ হয়েছে এবং তাদের কোনো সঠিক কৌশল নেই। ট্রাম্প এর প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, মার্জ কী বলছেন তা তিনি নিজেই জানেন না। এই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পরপরই সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাটি আসে।
জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস এই সিদ্ধান্তকে ‘পূর্বাভাসযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ইউরোপ এবং বিশেষ করে জার্মানিতে মার্কিন সেনার উপস্থিতি দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট জানিয়েছেন, তারা বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। গত বছর দ্য হেগ-এ অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে দেশগুলো তাদের জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। জার্মানি ইতোমধ্যে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে ৩.১ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে।
এই পরিস্থিতিতে মিত্রদেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের দেশগুলোর মধ্যে জোট ভেঙে পড়াই বর্তমানে বড় হুমকি। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন মনে করছে, তাদের নিরাপত্তার জন্য এখন থেকে নিজেদেরই বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। মূলত ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর প্রতিরক্ষা খরচের চাপ বাড়ানো এবং মার্কিন স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মূলত ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া যুদ্ধের বিষয়ে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের সমালোচনার পরই ট্রাম্প এই কঠোর পদক্ষেপ নিলেন। ট্রাম্প গত শনিবার বলেন, “আমরা এই সংখ্যা ৫,০০০-এর চেয়েও আরও অনেক বেশি কমিয়ে আনব।” শুধু জার্মানি নয়, ট্রাম্পের ক্ষোভের মুখে পড়েছে ইতালি ও স্পেনও। মিত্র দেশগুলো ইরান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত সহায়তা দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। ট্রাম্পের মতে, স্পেন ও ইতালি এই সংকটে কোনো কাজেরই আসেনি।
জার্মানি ইরান যুদ্ধের জন্য সরাসরি সেনা না পাঠালেও মার্কিন বাহিনীকে তাদের বিমানঘাঁটি ও অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। তবে জার্মান সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের মাটি ব্যবহার করে সরাসরি কোনো আক্রমণাত্মক অভিযান চালানো যাবে না। এ ছাড়া যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে সমুদ্রপথ সচল রাখতে একটি মাইনসুইপার জাহাজ পাঠানোর ঘোষণাও দিয়েছে বার্লিন। কিন্তু এসব পদক্ষেপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে মোটেও সন্তুষ্ট নন, তা তার সাম্প্রতিক সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর আগে ২০২০ সালেও ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে একইভাবে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সময় সেনা কমানোর হুমকি দিয়েছিলেন। এখন দ্বিতীয় দফায় সেই পথেই হাঁটছেন তিনি।