✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-০৩, | ২০:৫৯:৩৮ |যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং নির্বাচনি ঐতিহ্যে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে দেশটির নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে পরিচালিত হলেও, বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কেন্দ্রীয়ভাবে এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করেছে।
রয়টার্সের এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অন্তত আটটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে কেন্দ্রীয় প্রশাসন তদন্ত, ঝটিকা অভিযান এবং ভোটার তালিকার সংবেদনশীল তথ্যে প্রবেশের মাধ্যমে নির্বাচনের ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের জানুয়ারিতে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টি থেকে। সেখানকার নির্বাচন বোর্ডে হঠাৎ একটি ফোন আসে। কলদাতা নিজেকে ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস) একজন এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দিয়ে অবিলম্বে ভোটারদের রেকর্ড এবং ব্যক্তিগত তথ্য দাবি করেন। ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টি ডেমোক্র্যাট অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় রিপাবলিকান মহলে বরাবরই এটি আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। ডিএইচএস-এর ওই এজেন্ট ভোটারদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর, ভোটার রেজিস্ট্রেশন ফর্ম এবং ভোট দেওয়ার ইতিহাস জানতে চান। তিনি এটিকে 'সময় সংবেদনশীল তদন্ত' হিসেবে বর্ণনা করলেও, এর সুনির্দিষ্ট কারণ বা গন্তব্য সম্পর্কে কোনো তথ্য দেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচন হলেও তা পরিচালনার দায়িত্ব মূলত অঙ্গরাজ্যগুলোর। সাধারণত ডিএইচএস-এর কাজ সন্ত্রাসবাদ দমন বা সীমান্ত সুরক্ষা। ফলে তাদের এমন সরাসরি নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ স্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টির নির্বাচনি পরিচালক আন্তোনি হোয়াইট জানান, তারা আগে কখনো হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কাছ থেকে এমন ফোন পাননি। যদিও তারা তথ্য সরবরাহ করেছেন, কিন্তু এর পেছনে কেন্দ্রীয় সরকারের আসল উদ্দেশ্য কী, তা এখনও অস্পষ্ট।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই কর্মকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ওহাইও ছাড়াও নেভাদা, কলোরাডো, জর্জিয়া এবং দক্ষিণ ক্যারোলিনাসহ আটটি রাজ্যে ফেডারেল প্রশাসনের এই তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। নেভাদায় এফবিআই ভোটারদের তথ্য চেয়েছে, যা আগে কখনও ঘটেনি। কলোরাডোর অন্তত ৬৩টি কাউন্টির নির্বাচন কর্মকর্তারা এখন সম্ভাব্য কেন্দ্রীয় সমন বা ভোটকেন্দ্রে সশস্ত্র ফেডারেল এজেন্টদের উপস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আইনি পরামর্শ নিচ্ছেন।
কলোরাডোর রিপাবলিকান কর্মকর্তা স্টিভ শ্লাইকার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউসের সাথে যুক্ত একজন লবিস্ট তাকে সরাসরি ফোন করে ডমিনিয়ন ভোটিং মেশিনে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছিলেন। তিনি জানান, ওই লবিস্ট তাকে বলেছিলেন যে ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচনের এজেন্ডা বাস্তবায়নে স্থানীয় 'পার্টনার' খুঁজছে। শ্লাইকার এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ভোটিং মেশিনে কেন্দ্রীয় কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া কলোরাডোর আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও এই পরিকল্পনা নিয়ে লুকোছাপা করছেন না। তিনি তার রাজনৈতিক জনসভাগুলোতে নির্বাচনি ব্যবস্থাকে 'জাতীয়করণ' এবং অন্তত ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। তার প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভোটার তালিকায় কড়াকড়ি আরোপ, নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করা এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ডেটাবেজ ব্যবহার করে ভোটারদের যাচাই করার জন্য নতুন নির্বাহী আদেশ ও আইনের প্রস্তাব আনা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেল জ্যাকসন এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান আমেরিকানরা নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখুক। তিনি অবৈধ ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দিতে এবং অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অন্তত ২০ জন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, যারা ইতোপূর্বে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তারা সরাসরি এই বর্তমান প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জর্জিয়ার ফুলটন কাউন্টিতে নির্বাচনি অফিসে একটি বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ২০২০ সালের জালিয়াতির অভিযোগগুলো পুনরায় সামনে আনা। যদিও আদালত এবং নিরপেক্ষ নিরীক্ষা সংস্থাগুলো বারবার জানিয়েছে, ওই নির্বাচনে জালিয়াতির কোনো প্রমাণ মেলেনি।
মিনিসোটার সেক্রেটারি অফ স্টেট স্টিভ সাইমন এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, "এখন আমাদের এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে যেখানে আমাদের নিজেদের কেন্দ্রীয় সরকারই নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিতে পারে।" অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, আসন্ন নভেম্বর মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিশ্চিত করতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব কাউন্টিতে ভোটের ব্যবধান খুব সামান্য থাকে, সেখানে এই কেন্দ্রীয় চাপ নির্বাচনি ফলাফল পাল্টে দেওয়া বা চ্যালেঞ্জ জানানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন এক ধরনের ভীতি কাজ করছে। নেভাদার ডগলাস কাউন্টির কর্মকর্তা অ্যামি বারগানস বলেন, "এখানে একটি বড় ধরনের ভীতি ও হুমকির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমরা এখন প্রতিনিয়ত ভাবছি, এরপর হয়তো আমাদের অফিসেই ফেডারেল এজেন্টরা এসে দাঁড়াবে।" যুক্তরাষ্ট্রের আড়াইশ বছরের ইতিহাসে নির্বাচনী ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের এমন নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ দেশটির গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।