✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৯, | ০১:৩৮:২৮ |মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় নিজেই দাবি করেছিলেন, একজন প্রেসিডেন্টের জন্য সবচেয়ে দ্রুত স্বকীয় মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর পথ হলো কোনো রেড লাইন নির্ধারণ করা এবং পরবর্তীতে তা কার্যকর করতে ব্যর্থ হওয়া। ইরান যুদ্ধের প্রায় ছয় মাস অতিক্রম করার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন নিজের সেই পুরানো সতর্কবার্তার মুখেই এসে দাঁড়িয়েছেন। ওয়াশিংটনের চাপ সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখনো অবরুদ্ধ। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক হুমকি উপেক্ষা করে প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে। এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এখন মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের বিরুদ্ধেও সামরিক আক্রমণের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তবে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক এই কঠোর হুমকির পর বাস্তব পদক্ষেপের অভাব ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও দর কষাকষির সক্ষমতা নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরেছে।
ইরানের সাথে যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি পুনর্দখলের জট না খুলতেই ট্রাম্প সম্প্রতি ওমানের ওপর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ওমান যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে দেশটিতে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন তিনি। অথচ দীর্ঘকাল ধরে ওমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে গোপন কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষাকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। মূলত ইরান এবং ওমান বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে নতুন বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে একটি যৌথ চুক্তির চূড়ান্ত রূপ দিচ্ছে। এই চুক্তি কার্যকর হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর তেহরানের একক প্রভাব ও কর্তৃত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, এ ধরনের চুক্তি ওয়াশিংটনকে বাদ দিয়েই এই সংকট সমাধানের পথ তৈরি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও শর্তাবলিকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দেবে। এই উদ্বেগ থেকেই আঞ্চলিক মিত্র ওমানের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন কঠোর সুর।
তবে বিশ্লেষকদের মূল আলোকপাত এখন মার্কিন হুমকির কার্যকারিতার ওপর। কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প বেশ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক বা তেলবাহী জাহাজে ইরানি প্রতিটি আক্রমণের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি করে গুরুত্বপূর্ণ সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দেবে। এর পরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির জলযানে হামলা চালানো হয়, যার পেছনে ইরানের সরাসরি হাত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তা সত্ত্বেও ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ওই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মার্কিন সামরিক বাহিনীর কোনো স্পষ্ট বা দৃশ্যমান প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ দেখতে পাওয়া যায়নি। এর আগেও একের পর এক নির্দিষ্ট সময়সীমা বেধে দেওয়া হলেও প্রতিবারই শেষ মুহূর্তে মার্কিন পক্ষ থেকে শক্ত অবস্থান থেকে সরে আসার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান এবং ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক হুমকি যুক্তরাষ্ট্রকে বেশ দুর্বল অবস্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো এমনিতেই যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকায় বেশ হতাশ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। এই মুহূর্তে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানকে সামরিক হুমকি দেওয়া মানে অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্ব নষ্ট করা। ওমান ও ইরানের সম্ভাব্য নৌচুক্তি যদি সফল হয়, তবে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে মার্কিন প্রশাসনের সামনে এখন একটি সংকীর্ণ পথই খোলা রয়েছে: হয় তেহরানের শর্ত মেনে নেওয়া, না হয় আঞ্চলিক যুদ্ধ আরও বড় পরিসরে প্রসারিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ধরনের চরমপন্থী বক্তব্যের সমালোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ভেটেরান ও ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রভাবশালী সিনেটর মার্ক কেলি ট্রাম্পের এই ধরনের মন্তব্যের সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ওমান ওয়াশিংটনের অন্যতম নিরাপত্তা অংশীদার এবং মধ্যপ্রাচ্যে যে কোনো জটিল আলোচনার জন্য একটি অত্যন্ত জরুরি প্ল্যাটফর্ম। সেখানে এ ধরনের হুমকি পুরো আঞ্চলিক নিরাপত্তা অবকাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আজকের পরিস্থিতি ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক দর্শনের সাথেই অসংগতিপূর্ণ। ২০১৬ সালের রিপাবলিকান কনভেনশনে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সিরিয়া সংক্রান্ত 'রেড লাইন' নীতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। ওবামা আসাদ সরকারকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করলেও পরে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেননি, যাকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বলে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ওয়াশিংটনের নীতি পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আর কখনোই কোনো ফাঁকা হুমকি দেবে না। কিন্তু আজ হরমুজ প্রণালির বর্তমান অচলাবস্থা, ইরানের ক্রমাগত শর্ত না মানার জেদ এবং ওমানের স্বাধীন কূটনৈতিক পদক্ষেপে ট্রাম্প নিজের সেই ফাঁকা হুমকির লাল বৃত্তেই আটকা পড়েছেন কি না, সেই প্রশ্নই বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
সূত্র: গালফ নিউজ