✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৬, | ১৪:১৩:১৫ |ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় পুলিশের ওপর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
দেশটির বিচার বিভাগ জানিয়েছে, জানুয়ারিতে বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনায় ওই ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
ইরানের বিচার বিভাগের অনলাইন সংবাদমাধ্যম মিজান অনলাইন জানায়, শাহরাম সাদেগি নামের ওই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড বৃহস্পতিবার সকালে কার্যকর করা হয়।
বিচার বিভাগের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একটি অপারেশনাল কর্মকাণ্ড পরিচালনার’ অভিযোগে সাদেগিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, গত ৮ জানুয়ারি তেহরানের পশ্চিমে অবস্থিত কারাজ শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় সাদেগি একটি গাড়ি দিয়ে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে চাপা দেন। এতে সাত পুলিশ সদস্য আহত হন।
বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ওই ঘটনায় সাদেগির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়। পরে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং বৃহস্পতিবার সেই সাজা কার্যকর করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকট থেকে বিক্ষোভ
ইরানে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর অন্যতম বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ঢেউ দেখা যায়। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক দরপতনকে কেন্দ্র করে প্রথমে বিক্ষোভ শুরু হয়।
২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসেন। ওই সময় মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মূল্য রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ ধীরে ধীরে তীব্র হতে থাকে।
পরে রাজধানী তেহরানের বাইরে দেশের অন্যান্য প্রদেশেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথমদিকে দ্রব্যমূল্য ও অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও বিক্ষোভ দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়। সরকারবিরোধী স্লোগানের পাশাপাশি দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিক্ষোভকারীদের অনেকে।
কঠোর অবস্থান তেহরানের
বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নেয়। বিক্ষোভের সঙ্গে সহিংসতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে দেশের শত্রুরা অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
শাহরাম সাদেগির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর সেই কঠোর অবস্থানেরই একটি উদাহরণ। ইরানি বিচার বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যদের ওপর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি শুধু বিক্ষোভে অংশগ্রহণের বিষয় ছিল না; বরং এর সঙ্গে বিদেশি শক্তির পক্ষে পরিচালিত একটি ‘অপারেশনাল কর্মকাণ্ডের’ যোগসূত্র ছিল।
তবে ইরানি কর্তৃপক্ষের এই দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিক্ষোভের পেছনে অর্থনৈতিক ক্ষোভ
সাম্প্রতিক বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ইরানের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ছিল।
বিশেষ করে রিয়ালের ধারাবাহিক দরপতন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মূল্য রেকর্ড পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নামে।
তেহরানের বাজার ও ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অসন্তোষও প্রকাশ্যে আসে।
বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। কর্তৃপক্ষ একদিকে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দেয়, অন্যদিকে বিক্ষোভে সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অবস্থান বজায় রাখে।
শাহরাম সাদেগির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে জানুয়ারির বিক্ষোভকে ঘিরে ইরান সরকারের কঠোর বিচারিক পদক্ষেপের বিষয়টি আবারও সামনে এলো। সূত্র: আল-জাজিরা