সর্বশেষ :
দৈনন্দিন এই ১৫ অভ্যাস গোপনে আপনার দাঁত নষ্ট করে দিচ্ছে সাড়ে ৬ মিনিটেই ৯৮ শতাংশ চার্জ করা যাবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এক স্বপ্ন, তিন যোদ্ধা রোনালদোর ৯৭০ বিশ্বজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতার হিড়িক, সামরিক ব্যয় ছাড়াল ২.৮৮ ট্রিলিয়ন ডলার ভারতের মতো বিশ্বের কেউ কি সীমান্তে সাপ-কুমির ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিল? ৬৩তম দিন: ট্রাম্পের হামলার আভাসে নতুন জটিল পরিস্থিতিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে, বাজেটে নতুন পরিকল্পনা রেমিট্যান্সের ভিত্তি স্থাপন করেন শহীদ জিয়া, পূর্ণতা দিয়েছেন খালেদা : রাষ্ট্রপতি ইসরায়েলে কারানির্যাতনে ৬০ কেজি ওজন হারিয়েছেন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

ভারতের মতো বিশ্বের কেউ কি সীমান্তে সাপ-কুমির ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিল?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-০১, | ১৬:০৬:১০ |
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদীবেষ্টিত দুর্গম এলাকাগুলোতে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে কুমির ও বিষধর সাপ ছেড়ে দেওয়ার মতো এক বিতর্কিত পরিকল্পনা সামনে নিয়ে এসেছে ভারত। সীমান্তে অনুপ্রবেশ-চোরাচালান ঠেকাতে ‘প্রাকৃতিক বাধা’ তৈরি করতে এমন প্রস্তাব সামনে এনেছে দেশটি। 

প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে নদী, জলাভূমি, পাহাড়ি উপত্যকাসহ বাকি দুর্গম অঞ্চলে বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়। 
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) গত ২৬ মার্চের এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইউনিটগুলোকে ‘নদীপথের ফাঁকা অংশে সরীসৃপ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা’ খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, কঠিন ভৌগোলিক বাস্তবতার মধ্যেও বিএসএফ সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধে কাজ করছে। তবে নদীবেষ্টিত ও নিচু এলাকাগুলোতে বেড়া নির্মাণে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে—যেমন জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, স্থানীয়দের আপত্তি এবং প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা।


এই বাস্তবতায় বিকল্প হিসেবে ‘প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা’ ব্যবহারের ধারণা সামনে আসে। ধারণাটি হলো, যেখানে বেড়া দেওয়া যাচ্ছে না, সেখানে ভয়ংকর প্রাণীর উপস্থিতি অনুপ্রবেশ নিরুৎসাহিত করবে।

এমন ভাবনার কারণ 
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই প্রস্তাব কেবল নিরাপত্তা ভাবনা থেকে আসেনি; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। ভারতের ক্ষমতাসীন সরকার দীর্ঘদিন ধরে ‘অবৈধ অভিবাসন’কে জনসংখ্যাগত ও নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরছে।

তারা মনে করেন, এতে ভারতের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে যাচ্ছে। 

সমালোচকদের দাবি, এই বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের টার্গেট করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মান্দারের মতে, অনথিভুক্ত অভিবাসী সমস্যার সমাধানে কূটনৈতিক ও আইনি পথ অনুসরণ না করে ‘বিচারবহির্ভূত পদ্ধতি’ গ্রহণ করা হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘কাউকে কুমির বা সাপের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো সভ্য রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।’ 

বিশ্লেষক অঙ্গশুমান চৌধুরীর মতে, ‘এটি কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং মানুষের বিরুদ্ধে প্রকৃতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এক ভয়ংকর ধারণা।’
তিনি আরো বলেন, বাস্তবে এসব প্রাণী কখনোই কেউ ভারতীয় না কি বাংলাদেশি 
এমন পার্থক্য করতে পারবে না। এতে সীমান্তের উভয় পাশের সাধারণ মানুষই ঝুঁকিতে পড়বে।

ভারতের আসামসহ কয়েকটি রাজ্যে ‘বিদেশি ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাই করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত কাগজপত্র না থাকায় বহু প্রকৃত ভারতীয় নাগরিককেও ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়েছে।

আল-জাজিরাকে হর্ষ মান্দার বলেন, “ভারতের তথাকথিত ‘বিতর্কিত নাগরিকত্ব’ বিষয়টি নিষ্ঠুর এবং এটি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক রীতির লঙ্ঘন।”

তার মতে, এই প্রেক্ষাপটে কুমির-সাপ মোতায়েনের ধারণার মতো সীমান্তে কঠোরতা বাড়ানোর উদ্যোগ বাঙালি মুসলিমদের সার্বক্ষণিক এক আতঙ্কের মধ্যে রাখার কৌশল। 

অংশুমান চৌধুরীর ধারণা, সীমান্ত এলাকায় কুমির ও বিষধর সাপ ছাড়ার পরিকল্পনাটি মূলত ভারতীয় মুসলিমদের প্রতি সরকারের একই বিদ্বেষী নীতির বহিঃপ্রকাশ। 

পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ঝুঁকি
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবটি বাস্তবায়নযোগ্য নয় এবং মারাত্মক পরিবেশগত ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।

ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার কৌশল ও লিয়াজোঁ প্রধান রথীন বর্মন আল-জাজিরাকে বলেছেন, সীমান্তবর্তী অধিকাংশ নদীপথে স্বাভাবিকভাবে কুমিরের বসবাস নেই। সুন্দরবন বা আসামের নির্দিষ্ট জলাভূমিতে কুমির পাওয়া গেলেও সেগুলো সীমান্তের অধিকাংশ অংশ থেকে অনেক দূরে।

প্রাকৃতিক আবাসস্থল থেকে সরিয়ে এনে নতুন এলাকায় ছেড়ে দিলে প্রাণীগুলো টিকতে নাও পারে। এতে যেমন প্রাণীর মৃত্যু ঘটবে, তেমনি স্থানীয় খাদ্যশৃঙ্খল বা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হবে বলেও জানান তিনি।

একইভাবে বিষধর সাপ ছড়িয়ে পড়লে তা শুধু সীমান্তে নয়, আশপাশের গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা ও বন্যার সময় নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে এসব প্রাণী নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জেলে, কৃষক ও নদীনির্ভর জীবিকার সঙ্গে যুক্তরা এই প্রস্তাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন।

নদীতে মাছ ধরা, নৌপথে যাতায়াত বা কৃষিকাজের সময় কুমির বা বিষধর সাপের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে। ফলে জীবিকা ও নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।

বিশ্বে আর কোথায় এমন নজির আছে? 
আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশ সীমান্ত রক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে হিংস্র প্রাণী ব্যবহারের নজির নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে একসময় সীমান্তে কুমির বা সাপভর্তি পরিখা তৈরির ধারণা নিয়ে আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। দেশটির প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শুরু হওয়া এমন আলোচনাকে ভুয়া বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। 

ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘সীমান্ত সুরক্ষায় আমি কঠোর হতে পারি, তবে এতটাও নই।’
তবে ফ্লোরিডার একটি বিতর্কিত আটককেন্দ্র ‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’ নামে পরিচিত, যেখানে দুর্গম জলাভূমি প্রাকৃতিক নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করে। তবে কেন্দ্রটির অমানবিক পরিবেশ এবং পরিবেশের ক্ষতির সমালোচনা করে এটি বন্ধের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। 

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..