মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন করে জটিল আকার নিচ্ছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি বাড়ছে, আর একই সঙ্গে সহিংস ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে- যা পুরো অঞ্চলকে অস্থির করে তুলেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরানের বন্দর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কোনো সাধারণ কৌশল নয়, বরং এটি সরাসরি সামরিক অভিযানের অংশ। তিনি এই পদক্ষেপকে 'অগ্রহণযোগ্য' উল্লেখ করে বলেন, এতে আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, চলমান আলোচনা খুব সীমিত পর্যায়ে রয়েছে এবং এর বিস্তারিত কেবল অল্প কয়েকজন জানেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানায়, ইরানের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাজধানী তেহরানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে, যাতে ড্রোন ও ছোট আকাশযান থেকে সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করা যায়।
দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতায় ইরান এমন পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল। সমুদ্রে তেলের মজুত, বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা এবং বড় অভ্যন্তরীণ বাজার- এই তিনটি বিষয় দেশটিকে তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামলাতে সহায়তা করছে। তাদের মতে, বহু বছর চাপের মধ্যে থাকার ফলে ইরান তুলনামূলক কঠিন পরিস্থিতিতেও টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরি করেছে।
তবে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্রের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মার্ক কিমিট মনে করেন, সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে দ্রুত কোনো সমাধান আসবে না। এই ধরনের চাপ অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লে আলোচনার পথ খুলতে পারে।
এদিকে ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তেও উত্তেজনা কমেনি।
যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে বিস্ফোরক ড্রোন হামলায় ইসরায়েলি সেনার আহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মানবিক পরিস্থিতিও ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, বেসামরিক প্রাণহানি কমাতে তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা রয়েছে এবং সামরিক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার হলেও মানুষের তদারকি বজায় থাকে। তবে যুদ্ধের শুরুতে একটি স্কুলে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনায় সমালোচনা তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরান জানিয়েছে, হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৫৪ জন শিশু।
উপসাগরীয় অঞ্চলেও সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের নাগরিকদের ইরান, লেবানন ও ইরাকে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকতে বলেছে। পাশাপাশি যারা এসব দেশে অবস্থান করছেন, তাদের দ্রুত দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিই এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শত্রুতা এখন কার্যত শেষ এবং দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে। তার মতে, এপ্রিলের শুরু থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি কোনো সংঘর্ষ হয়নি। তবে মাঠপর্যায়ের বিচ্ছিন্ন হামলা ও উত্তেজনা সেই দাবিকে পুরোপুরি সমর্থন করে না।
এই পুরো পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চার বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট- দুই ধরনের তেলের দামই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা জ্বালানি খরচ বাড়িয়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, সামরিক উত্তেজনা, অনিশ্চিত কূটনীতি, মানবিক সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপ- এই চারটি মাত্রা মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত কোনো সমাধান না এলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত আকারে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ জাতীয় আরো খবর..