যুক্তরাষ্ট্রের চারজন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন, তারা হলেন—আব্রাহাম লিঙ্কন (১৮৬৫),
জেমস এ. গারফিল্ড (১৮৮১), উইলিয়াম ম্যাককিনলি (১৯০১), জন এফ. কেনেডি (১৯৬৩)।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তারা আততায়ীর হামলায় নিহত হয়েছেন। এছাড়া আরও অনেক প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন সময়ে মারাত্মক সব প্রাণঘাতী হামলার মুখোমুখি হয়েছেন। ১৮৩৫ সালে প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন অ্যান্ড্রু জ্যাকসন। তবে এর ঠিক ৩০ বছর পর আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান আব্রাহাম লিংকন। সম্ভবত আপনি এমন অন্তত আরও একজন প্রেসিডেন্টের নাম বলতে পারবেন যার এমন পরিণতি হয়েছিল। কিন্তু আপনি কি তাদের সবার নাম বলতে পারবেন?
আব্রাহাম লিংকন ও গৃহযুদ্ধ পরবর্তী ট্র্যাজেডি
১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল। আমেরিকার রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র পাঁচ দিন পর ওয়াশিংটনের ফোর্ডস থিয়েটারে 'আওয়ার আমেরিকান কাজিন' নাটক দেখতে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। নাটকের মাঝপথেই জন উইলকস বুথ নামের এক অভিনেতা প্রেসিডেন্টের মাথার পেছনে গুলি করেন। গুরুতর আহত লিংকনকে রাস্তার উল্টো পাশের পিটারসেন হাউসে নেওয়া হয়। পরদিন সকাল ৭টা ২২ মিনিটে তিনি মারা যান।
ঘাতক বুথ ছিলেন একজন ব্যর্থ অভিনেতা ও কনফেডারেট সমর্থক। হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও প্রায় দুই সপ্তাহ পর ভার্জিনিয়ার একটি খামারে তাকে ঘিরে ফেলে সেনাবাহিনী। আত্মসমর্পণ করতে রাজি না হওয়ায় সেনাদের গুলিতেই বুথ নিহত হন।
জেমস গারফিল্ড ও সেকালের চিকিৎসা
প্রেসিডেন্ট জেমস গারফিল্ডের ওপর হামলার ঘটনাটি ঘটে ১৮৮১ সালের ২ জুলাই। সে সময় পেনিসিলিন আবিষ্কৃত হলে হয়তো গারফিল্ড বেঁচে যেতেন। কিন্তু তখন অ্যান্টিবায়োটিকের অভাব এবং আধুনিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় চিকিৎসকেরা বারবার প্রেসিডেন্টের ক্ষতস্থানে অস্বাস্থ্যকর উপায়ে গুলি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। এতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। দীর্ঘ দুই মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৮৮১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।
ঘাতক চার্লস গুইটো ছিলেন একজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তি। সরকারি চাকরি না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রেসিডেন্টকে অনুসরণ করছিলেন। ২ জুলাই ওয়াশিংটন ডিসির একটি স্টেশনে ট্রেনে ওঠার সময় তিনি গারফিল্ডকে গুলি করেন। বিচারের পর ১৮৮২ সালের ৩০ জুন তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
উইলিয়াম ম্যাকিনলি ও নৈরাজ্যবাদী হামলা
১৯০১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের বাফেলোতে 'প্যান-আমেরিকান এক্সপজিশন' নামের একটি অনুষ্ঠানে দর্শকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছিলেন প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাকিনলি। ঠিক সেই সময় ভিড়ের মধ্য থেকে লিওন চোলগোস নামের এক ব্যক্তি বেরিয়ে এসে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে প্রেসিডেন্টের পেটে দুটি গুলি করেন। ঘটনার আট দিন পর ১৪ সেপ্টেম্বর গুলিতে সৃষ্ট পচনের কারণে তার মৃত্যু হয়।
নিজেকে 'নৈরাজ্যবাদী' দাবি করা চোলগোসকে উপস্থিত জনতা আক্রমণ করলেও পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। পরে ইলেকট্রিক চেয়ারে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তার শেষ কথা ছিল—'আমি আমার অপরাধের জন্য লজ্জিত নই, শুধু আফসোস যে বাবার সঙ্গে দেখা হলো না।'
জন এফ কেনেডি ও টেলিভিশন যুগ
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডটি ঘটে ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর। টেক্সাসের ডালাসের রাজপথ দিয়ে মোটর শোভাযাত্রা নিয়ে যাওয়ার সময় জন এফ কেনেডিকে গুলি করা হয়। ঘাড় ও মাথায় গুলি লাগার পর তিনি তার স্ত্রী জ্যাকিলিন কেনেডির পাশেই ঢলে পড়েন।
টেক্সাস স্টেট বুক ডিপোজিটরি ভবনের ছয় তলা থেকে লি হার্ভে অসওয়াল্ড নামের এক ব্যক্তি এই হামলা চালিয়েছিলেন। ওই দিনই ডালাসের একজন পুলিশ কর্মকর্তা জে ডি টিপিটকে গুলি করে হত্যার পর অসওয়াল্ড গ্রেপ্তার হন।
কেনেডি হত্যাকাণ্ড ছিল আধুনিক প্রচারমাধ্যম যুগের প্রথম বড় কোনো ট্র্যাজেডি। তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবরটি কয়েক সপ্তাহ ধরে টিভি এবং রেডিওতে প্রধান সংবাদ হিসেবে প্রচারিত হয়েছিল। কেনেডির মারা যাওয়ার দুই দিন পর যখন অসওয়াল্ডকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হচ্ছিল, তখন জ্যাক রুবি নামের এক ব্যক্তি তাকে হত্যা করেন। রুবির মৃত্যু হয় ১৯৬৭ সালে কারাগারে থাকাকালীন।
ব্যর্থ হওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু হত্যাচেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রায় শুরু থেকেই প্রেসিডেন্টদের হত্যার ষড়যন্ত্র হয়ে আসছে। ১৮৩৫ সালে রিচার্ড লরেন্স নামের এক ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনকে গুলি করতে চাইলেও পিস্তল জ্যাম হয়ে যাওয়ায় তিনি রক্ষা পান।
১৯১২ সালে থিওডোর রুজভেল্ট যখন পুনরায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার লড়াই করছিলেন, তখন জন শ্র্যাঙ্ক নামের এক ব্যক্তি তার বুকে গুলি করেন। রুজভেল্টের বুকপকেটে থাকা চশমার কেস এবং দীর্ঘ ভাষণের পান্ডুলিপির জন্য তিনি সে যাত্রায় বেঁচে যান।
১৯৩৩ সালে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের ওপর হামলা করেন জিউসেপ্পে জাঙ্গারা। সেবার রুজভেল্ট বেঁচে গেলেও শিকাগোর মেয়র আন্তন চারমাক নিহত হন। ১৯৫০ সালে হ্যারি ট্রুম্যানের বাসভবনে হানা দিয়েছিলেন পুয়ের্তো রিকোর দুই অধিকারকর্মী, কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপে ট্রুম্যান অক্ষত থাকেন।
১৯৭৫ সালে লিনেট 'স্কুইকি' ফ্রোম নামের এক নারী প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর চেষ্টা করলেও বন্দুক বিকল থাকায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তার দাবি, এই কাজের মাধ্যমে তিনি পরিবেশ দূষণের প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। ১৯৮১ সালে জন হিন্কলি জুনিয়রের গুলিতে মারাত্মক আহত হন রোনাল্ড রিগান। হামলাকারী হিন্কলি দাবি করেছিলেন, অভিনেত্রী জোডি ফস্টারের নজর কাড়তেই তিনি এই হামলা চালিয়েছিলেন।
আধুনিক যুগেও জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলার ষড়যন্ত্রের নজির রয়েছে, যা রুখে দিয়েছে সিক্রেট সার্ভিস। উইলিয়াম ম্যাকিনলির মৃত্যুর পর থেকেই এই সংস্থাটি প্রেসিডেন্টের পূর্ণকালীন নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে।
সূত্র: উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম
এ জাতীয় আরো খবর..