✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-১৭, | ২৩:৫৮:৫৬ |গরমের তীব্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু উৎপাদন ঘাটতির কারণে সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। ফলে দেশে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়ানক খারাপ। জেলা পর্যায়ে কোথাও ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বা এর চেয়েও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানা গেছে। সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং ইতোমধ্যে জনজীবনে ভয়াবহ দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে।
জেলা শহরগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। ফলে দিনের বড় একটি সময়জুড়ে বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। প্রচণ্ড রোদে ও তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, অফিস-আদালতের কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষিজীবীরা পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়।
বিদ্যুৎনির্ভর ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন চালাতে পারছে না। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ না থাকায় কলকারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে কৃষি খাতে সেচ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় ফসল উৎপাদন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই সংকট দীর্ঘ মেয়াদে আরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও অদক্ষতায় হচ্ছে ঘাটতি
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানিসংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে ৩৩টি কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সচল থাকা বাকিগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না, যার প্রধান কারণ জ্বালানিসংকট।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের এই বিশাল ব্যবধান লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। পিজিসিবি ও পিডিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তীব্র গরমের এই মৌসুমে চাহিদার সময় সারা দেশে লোডশেডিং ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, অনেক এলাকায় ৩০ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। খুলনা, ঘোড়াশাল, হরিপুর, মেঘনাঘাট, আশুগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ এবং বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন ইউনিট জ্বালানিসংকট বা রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলের তীব্র সংকটে ভুগছে। ঢাকা অঞ্চলে ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও জ্বালানিসংকটের কারণে সেগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে সিলেট বিভাগে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গতকাল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আজ সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় টানা ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন–এই সময়ে দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যায়। তবে এবার বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি খারাপের দিকে যাচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা চলছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন বলেও তারা স্বীকার করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মত: শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) এর সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিপাদ্য ছিল ‘জ্বালানিসংকট এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নগরায়ণ ও উন্নয়ন ভাবনা’। আইপিডির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে একাধিক সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে–নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, সোলারসহ বিকল্প জ্বালানির উৎসে অর্থায়ন বাড়াতে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও উন্নয়ন অংশীদারদের সহযোগিতা কাজে লাগাতে হবে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে কর-সুবিধা ও ভর্তুকি প্রদান এবং গ্রামীণ পর্যায়ে মাইক্রোফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে সৌরপ্রযুক্তির বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন।
সংলাপে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় জ্বালানির চাহিদা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি, যা একটি বৈষম্য তৈরি করছে। এই বৈষম্য কমাতে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের মতো বিদ্যুৎ বরাদ্দেও বৈষম্য রয়েছে, যা দেশের উন্নয়নকে এককেন্দ্রিক করে তুলছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা, জবাবদিহি ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।
এ সময় স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর শিক্ষক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল বলেন, গ্রামে এখন বিদ্যুৎ কেবল মাঝে মাঝে আসে। বিগত সরকার সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের নীতি নিয়েছিল। অথচ গোষ্ঠীস্বার্থে বসিয়েছিল সৌরবিদ্যুৎ উপকরণের ওপর চড়া কর। সেটা ছিল বড় প্রহসন।
আইপিডি রিসার্চ ফেলো ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, বিশ্বব্যাপী ভবনের টেকসই ডিজাইনের মাধ্যমেই জ্বালানির ৪০-৫০ শতাংশ সাশ্রয় করা সম্ভব হয়, তাই গ্রিন বিল্ডিং ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি জরুরি।
এদিকে সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং বিষয়টি শিকার করেছেন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। শুক্রবার চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে কৃষি ও শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। এ কারণে গৃহস্থালি খাতে তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে মে মাসে ফসল সংগ্রহ শুরু হলে গৃহস্থালি খাতকে আবারও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এ সময় লোডশেডিং নিয়ে প্রশ্ন করায় বিভ্রান্ত হয়ে যান বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী। গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নটি ছিল, চট্টগ্রামে ৫-৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনার তথ্য আপনার কাছে থাকুক, আমি অফিশিয়াল চ্যানেল থেকে তথ্য পেয়েছি। আপনার কাছে কী তথ্য আছে সেটা আপনার কাছে–আর যখন আমার চেয়ার থেকে কথা বলছি, আমার প্রতিটি অঙ্ক, প্রতিটি শব্দের পেছনে দায়িত্বশীলতা আছে। আপনি আপনারটা নিয়ে আরগু করতে পারেন, আই অ্যাম সরি ফর দ্যাট।’