গরমে ঘরে ফিরেই এসি চালিয়ে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে চান অনেকেই। কিন্তু সেই আরামের পেছনে মাস শেষে কত টাকা খরচ হচ্ছে, বিদ্যুৎ বিল হাতে পেলেই শুরু হয় নতুন দুশ্চিন্তা। কেউ তাই এসি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েও পিছিয়ে যান, আবার কেউ কম দামে এসি কিনে পরে বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের চাপে পড়েন।
অথচ এসি কেনার সময় কয়েকটি হিসাব জানা থাকলে এই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই ক্ষমতার দুটি এসি হলেও বিদ্যুৎ খরচ এক নাও হতে পারে। বিশেষ করে ‘থ্রি-স্টার’ ও ‘ফাইভ-স্টার’ রেটিং, ইনভার্টার প্রযুক্তি এবং ব্যবহারের অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে মাস শেষে বিদ্যুৎ বিলের অঙ্ক।
ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি রনি হোসেন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে এসি স্থাপনের কাজ করছেন। তার অভিজ্ঞতায়, এসি কেনার সময় অনেকেই যন্ত্রের দাম ও শীতল করার ক্ষমতা দেখলেও বিদ্যুৎ খরচের হিসাবটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন না।
থ্রি-স্টার ও ফাইভ-স্টার:স্টারের সংখ্যায় কতটা সাশ্রয়?
রনি হোসেন বলেন, একই ক্ষমতার দেড় টনের দুটি এসির বিদ্যুৎ খরচ এক নাও হতে পারে। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এসির শক্তি সাশ্রয়ের দক্ষতা। সাধারণভাবে, বেশি স্টার রেটিংয়ের এসি একই ধরনের শীতলতা দিতে তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে।
সহজ কথায়, ফাইভ-স্টার এসি কিনতে শুরুতে কিছুটা বেশি টাকা লাগলেও দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিলের সাশ্রয় সেই বাড়তি খরচ পুষিয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে।
মাসে কত টাকা বেশি খরচ হতে পারে?
ঢাকার রিংরোড এলাকার হোলসেল ইলেকট্রনিক্স সিটির কর্ণধার ফয়সাল হোসেনের দেয়া হিসাব অনুযায়ী, দেড় টনের একটি ফাইভ-স্টার এসি প্রতি ঘণ্টায় আনুমানিক ০.৮ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। প্রতিদিন আট ঘণ্টা চালালে মাসে বিদ্যুৎ খরচ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৯২ ইউনিট।
অন্যদিকে, একই ক্ষমতার একটি থ্রি-স্টার এসি ঘণ্টায় আনুমানিক ১.১ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রতিদিন আট ঘণ্টায় খরচ হবে ৮.৮ ইউনিট। মাসে তা দাঁড়াবে প্রায় ২৬৪ ইউনিট।
অর্থাৎ, এই উদাহরণে মাসে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পার্থক্য প্রায় ৭২ ইউনিট। বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম, অন্যান্য চার্জ এবং প্রকৃত ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে বিলের পার্থক্যও কমবেশি হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো আনুমানিক হিসাব। এসির মডেল, ঘরের তাপমাত্রা, বাইরের গরম, ধারণক্ষমতা ও কম্প্রেসরের কার্যক্রম অনুযায়ী প্রকৃত বিদ্যুৎ খরচ বদলে যেতে পারে। তাই কেনার আগে নির্দিষ্ট মডেলের বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য দেখে নেওয়া জরুরি।
ইনভার্টার এসি কেন সাশ্রয়ী হতে পারে?
এসি কিনতে গেলে বিক্রেতাদের মুখে প্রায়ই শোনা যায় ইনভার্টার কিংবা ডুয়াল ইনভার্টার প্রযুক্তির কথা। কিন্তু এই প্রযুক্তি কীভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে, তা অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়।
সাধারণ এসির কম্প্রেসার সাধারণত চালু হলে নির্দিষ্ট ক্ষমতায় চলে এবং ঘরের তাপমাত্রা নির্ধারিত পর্যায়ে পৌঁছালে বন্ধ হয়ে যায়। তাপমাত্রা আবার বাড়লে সেটি চালু হয়। এভাবে বারবার চালু ও বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ খরচ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, ইনভার্টার এসি ঘরের তাপমাত্রা অনুযায়ী কম্প্রেসরের গতি ও কার্যক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী শীতলতা বজায় রাখা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ খরচ কমে।
তবে ইনভার্টার হলেই সব এসি সমান সাশ্রয়ী হবে, এমন নয়। মডেলভেদে শক্তি সাশ্রয়ের দক্ষতা যাচাই করেই কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।
১৬ ডিগ্রিতে এসি চালালেই কি দ্রুত ঠান্ডা হবে?
অনেকেই ঘরে ঢুকেই এসির তাপমাত্রা ১৬ থেকে ১৮ ডিগ্রিতে নামিয়ে দেন। ধারণা, এতে ঘর দ্রুত ঠান্ডা হবে। কিন্তু এভাবে তাপমাত্রা কমিয়ে রাখলে সব ক্ষেত্রে দ্রুত শীতলতা পাওয়া যায় না বরং কম্প্রেসারকে দীর্ঘ সময় বেশি কাজ করতে হতে পারে।
সাধারণভাবে ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এসি চালিয়ে আরামদায়ক পরিবেশ বজায় রাখা যায়। এতে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচও কমতে পারে। তবে ঘরের আকার, আর্দ্রতা ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী উপযুক্ত তাপমাত্রা বেছে নেওয়া উচিত।
ছোট কয়েকটি অভ্যাসেই কমতে পারে বিদ্যুৎ বিল
শুধু দামি বা উন্নত প্রযুক্তির এসি কিনলেই বিদ্যুৎ বিল কম থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যবহারের কিছু অভ্যাসও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
রনি হোসেনের পরামর্শ, ঘরের দরজা-জানালা ভালোভাবে বন্ধ রাখতে হবে। ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে গেলে এসিকে ঘর ঠান্ডা রাখতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। পাশাপাশি পর্দা বা জানালার আচ্ছাদন ব্যবহার করে সরাসরি সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ কমানো যেতে পারে।
এ ছাড়া এসির ফিল্টারে ধুলা জমলে বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। এতে শীতল করার দক্ষতা কমে যেতে পারে। তাই প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত ফিল্টার পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজনমতো এসির সার্ভিসিং করানো জরুরি।
এসি কেনার আগে যে হিসাবটি জরুরি
এসি কেনার সময় শুধু যন্ত্রের দাম দেখলে চলবে না। একই সঙ্গে দেখতে হবে স্টার রেটিং, বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতা, ইনভার্টার প্রযুক্তি, ঘরের আয়তনের সঙ্গে এসির ক্ষমতার সামঞ্জস্য এবং বিক্রয়োত্তর সেবার বিষয়গুলো।
শুরুতে কম দামের এসি কিনে পরে বেশি বিদ্যুৎ বিল দিতে হলে শেষ পর্যন্ত মোট খরচ বেড়ে যেতে পারে। আবার প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্ষমতার এসি কিনলেও অযথা খরচের ঝুঁকি থাকে।
তাই এসি কেনার আগে একটু হিসাব করুন। সঠিক মডেল নির্বাচন, উপযুক্ত তাপমাত্রা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এই তিনটি বিষয় মাথায় রাখলে গরমে আরাম পাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিলের চাপও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
এ জাতীয় আরো খবর..