জ্যামাইকা ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র। কোনো দেশের সঙ্গে জ্যামাইকার স্থল সীমান্ত নেই। দেশটির প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে কিউবা, হাইতি ও ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র অন্যতম। কিংসটোন দেশটির বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। পর্যটন, খনি, কৃষি, ব্যবসা, পরিহান ও উত্পাদন জ্যামাইকার প্রধান আর্থিক খাত।
দেশটির আয়তন ১০ হাজার ৯৯১ বর্গমাইল। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশটির মোট জনসংখ্যা ২৮ লাখ ২৪ হাজার ৯১৩ জন। তাদের বেশির ভাগ খ্রিস্টধর্মের অনুসারী। স্থানীয় মুসলিম নেতাদের দাবি, জ্যামাইকায় ছয় হাজারের মতো মুসলমান বসবাস করে। যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে মুসলমানদের সংখ্যা আরো কম।
১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সঙ্গে আসা নাবিকরা ও দাসরাই ছিল জ্যামাইকায় আগমনকারী সর্বপ্রথম মুসলিম। দাসদের বেশির ভাগই ছিল পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম অধু্যষিত অঞ্চলগুলো থেকে। ঐতিহাসিকদের মতে, আফ্রিকা থেকে আগত দাসদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশই ছিল মুসলিম। এছাড়াও তাদের স্পেনের মুর মুসলিমদেরও দাস হিসেবে জ্যামাইকায় নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল। জ্যাকাইকার দাসমুক্তি সংগ্রামে মারুন আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মারুন শব্দের অর্থ বসতি ছেড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়া লোক। জ্যামাইকায় নিয়ে আসা দাসরা বিভিন্ন খামার থেকে পালিয়ে দুর্গম অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল এবং স্বাধীন বসতি স্থাপন করে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এই আন্দোলনকে সরাসরি মুসলমানদের সংগ্রাম বলা না গেলেও তা ইসলামী আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিল এবং মুসলমানরা এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।
যেমন তাদের পালিয়ে যাওয়া এবং স্বতন্ত্র বসতি স্থাপনে হিজরত ও উম্মাহ ধারণার অনুপ্রেরণা ছিল। দাসত্বের অবসান ও প্রতিরোধ সংগ্রামেও ইসলাম ছিল বড় অনুপ্রেরণা। কথিত আছে, ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশদের সঙ্গে শানি্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর মারুনদের নেতা কুদজে মুসলিমরীতিতে সিজদা করেছিলেন। ১৭৬০ সালে সংঘটিত ট্যাকি বিদ্রোহও ইসলামী রীতি, আদর্শ ও প্রতিরোধ কেৌশল দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল।
১৬৫৫ খ্রিস্টাব্দে স্প্যানিশ বাহিনীকে পরাজিত করে ব্রিটিশ বাহিনী জ্যামাইকা দখল করে। স্প্যানিশদের মতো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলেও জ্যামাইকায় ইসলাম চর্চা কঠোরভাবে নিষদ্ধি ছিল। তখন কোরআনসহ যে কোনো ইসলামী নিদর্শন ব্যবহার ও সংরক্ষণ নিষদ্ধি করা হয়। পাশাপাশি জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়। ফলে উনিশ শতকের শুরু ভাগেই জ্যামাইকা থেকে ইসলামের প্রকাশ্য সব নিদর্শন ও রীতি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এত নিপীড়ন সত্ত্বেও, দাসত্বে আবদ্ধ মুসলিমরা নানা সূক্ষ্ম উপায়ে নিজেদের ধর্মবিশ্বাস টিকিয়ে রেখেছিলেন। এর মধ্যে ছিল আখ খামারের দেয়াল ও বিভিন্ন স্থাপনায় আরবি লিপিতে দেয়াল লিখন, যা ছিল তাদের পরিচয় ও ধর্মীয় অনুরাগের সাংকেতিক প্রকাশ। তাদের মধ্যে মেৌখিকভাবে দ্বিন শেখানোর ঐতিহ্যও টিকে ছিল। তারা গল্প ও প্রবাদ-প্রবচনের মাধ্যমে ইসলামের মেৌলিক বিশ্বাস ও শিক্ষাগুলো পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিত। পাশাপাশি তাদের মধ্যে কোরআন মুখস্থ করার প্রচলনও ছিল।
মুসলমানদের অসি্তত্ব রক্ষার একটি উদাহরণ হলো ১৮২০ সালের কাছাকাছি সময়ে রচিত একটি আরবি পাণ্ডুলিপি, যা মুহাম্মদ কাবা সাগানুগু রচনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা একজন প্রবীণ মুসলিম এবং দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ।
পাণ্ডুলিপিটিতে কাদিরিয়া সুফি তরিকার অনুসরণে নামাজ, অজু ও বিয়ের বিধি-বিধান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যা প্রমাণ করে, ১৮৩৪ সালে দাসপ্রথা বিলুপ্তির প্রাক্কালেও দাসত্বে আবদ্ধ মুসলিমরা আরবি ভাষা ও ধর্মীয় জ্ঞান চর্চার ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রেখেছিল।
জ্যামাইকায় মুসলিম আগমনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় মুসলিম শ্রমিকদের মাধ্যমে। বৃটিশ সরকার ১৮৪৫ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও বিহার অঞ্চল থেকে প্রায় ৩৭ হাজার চুক্তিবদ্ধ শ্রমিককে জ্যামাইকায় নিয়ে আসে। তাদের প্রায় ১৬ শতাংশ ছিল মুসলিম। চুক্তিভিত্তিক শ্রমের শর্ত ছিল অত্যন্ত কঠোর। তার মধ্যেও মুসলিমরা ইসলামের মেৌলিক বিধান মেনে চলত।
খামারে কাজ করার পাশাপাশি তারা পশু পালন করত এবং হালাল খাবার খেত। আরবি ও উদর্ু ভাষা চর্চা করত এবং ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নামাজ আদায় করত।
১৯১৭ সালে চুক্তিবদ্ধ শ্রম ব্যবস্থার অবসান হয়। ফলে মুসলমানরা আরো স্বাধীনভাবে চলাফেরা, কাজ করা, বসতি স্থাপন ও যোগাযোগের সুযোগ পায়। সে সময় সযত্নে ও গোপনে আগলে রাখা ইসলামী রীতি-নীতি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। ভারত থেকে আগত মুসলমানদের নেতা মুহাম্মদ খানের নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালে নির্মিত হয় জ্যামাইকার প্রথম মসজিদ Èমসজিদে আর রহমান'।
১৯৬২ সালে স্বাধীনতা লাভের পর জ্যামাইকায় একাধিক মুসলিম সংগঠন ইসলাম প্রচারে মনোযোগী হয়। ফলে সেখানে ইসলাম গ্রহণের হার বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জ্যামাইকায় কিছু আরব মুসলমানের আগমন ঘটে। তারা ছিল প্রধানত ব্যবসায়ী। ফলে দেশের অর্থনীতিতেও মুসলমানদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। সর্বশ্রেণির মুসলমানকে সংঘবদ্ধ করতে ১৯৮১ সালে গঠিত হয় ইসলামিক কাউন্সিল অব জ্যামাইকা।
সংগঠনটি দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। জ্যামাইকায় মুসলমানদের বেশির ভাগ শহরাঞ্চলে বসবাস করে। বর্তমানে দেশটি ১২ সরকার অনুমোদিত মসজিদ আছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্যের শিকার হলেও জ্যামাইকান মুসলিম সাংবাধিক ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করে।
তথ্যসূত্র : ক্যারিবিয়ান মুসলিমস ডটকম, দাওয়া ডটসেন্টার ও উইকিপিডিয়া
এ জাতীয় আরো খবর..