আজাদি টাওয়ার আধুনিক ইরানের সবচেয়ে নান্দনিক স্থাপত্য। রাজধানী তেহরানের পশ্চিম প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা আজাদি টাওয়ার শুধু একটি স্থাপত্য নিদর্শন নয়; বরং তা ইরানের গৌরবময় অতীত ও আধুনিক অগ্রযাত্রার প্রতীকী স্মারক। এতে মিশে গেছে ইরানের হাজার বছরের ইতিহাস, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক পদচিহ্ন। ইরানের সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত টাওয়ারটি দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন প্রাচীন পারস্যের কোনো বিজয়তোরণ আধুনিক যুগে এসে নবরূপ নিয়েছে। রাজতান্ত্রিক যুগে নির্মিত হলেও ইসলামী বিপ্লবের পরও স্থাপনা রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করেছে। ফারসি ভাষায় আজাদি টাওয়ারের নাম ‘বুর্জ আজাদি’। প্রথমে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বুর্জ শাহইয়াদ’ শাহের স্মৃতিস্তম্ভ। ইসলামী বিপ্লবের পর নাম রাখা হয় আজাদি টাওয়ার। তেহরানের পশ্চিম প্রান্তের প্রবেশ পথে অবস্থিত আজাদি টাওয়ার আজাদি স্কয়ারের অংশ।
গত শতকের ষাটের দশকে ইরানে তেলভিত্তিক অর্থনীতির যুগে প্রবেশ করে। ফলে ইরানে দ্রুত আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন দেশের শাসক ছিলেন মুহাম্মদ রেজা পাহলভি। তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের আড়াই হাজার বছর পূর্তি উপলক্ষে এমন একটি জাতীয় স্মারক নির্মাণের উদ্যোগ নেন, যা ইরানের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও আধুনিক অগ্রগতির প্রতীক হবে। ১৯৬৬ সালে একটি আন্তর্জাতিক স্থাপত্য প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। এতে জয়ী হন তরুণ ইরানি স্থপতি হোসেইন আমানত।
তার নকশায় প্রাচীন পারস্য স্থাপত্যের খিলান, ইসলামী যুগের জ্যামিতিক রীতি এবং আধুনিক প্রকৌশল প্রযুক্তির সমন্বয় দেখা যায়। আজাদি টাওয়ারের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৬৯ সালে এবং শেষ হয় ১৯৭১ সালে। আজাদি টাওয়ার প্রায় ৪৫ মিটার (১৪৮ ফিট) উঁচু। পুরো কাঠামোটি সাদা ইসফাহানি মার্বেল পাথরে তৈরি।এতে মার্বেল পাথরের আট হাজার ব্লক বসানো হয়েছে, যার প্রতিটি ব্লক নিখুঁতভাবে কাটা ও স্থাপন করা হয়েছে। টাওয়ারের নকশার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর খিলান। নিচের অংশে সাসানীয় যুগের ঘোড়ার নাল আকৃতির খিলান দেখা যায়, আর ওপরের অংশে রয়েছে ইসলামি স্থাপত্যের সূচালো খিলান। এই দুই ধরনের খিলান একত্রে ইরানের ইসলামপূর্ব ও ইসলামী ইতিহাসের মিলনকে নির্দেশ করে। আর ক্রম ঊর্ধ্বমান ভবন ইরানের অগ্রযাত্রার প্রতি ইঙ্গিতবহ।
টাওয়ারের গায়ে জ্যামিতিক নকশা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা হয়েছে। এই নকশা করতে কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়। সূর্যের আলো পড়লে মার্বেলের ওপর আলো-আধারি তৈরি হয়, যা দিনভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। আজাদি টাওয়ার নির্মাণে ইরানের পাঁচ শ ধনী ব্যক্তি অর্থায়ন করেন এবং এটি নির্মাণে প্রায় ছয় মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল। ১৬ অক্টোবর ১৯৭১ সালে টাওয়ারটি উদ্বোধন করা হয় এবং ১৪ জানুয়ারি ১৯৭২ জনসাধারণের উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
আজাদি টাওয়ারের অভ্যন্তরীণ অংশ বহুস্তরবিশিষ্ট। টাওয়ারের শীর্ষে একটি পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যেখান থেকে তেহরানের বিস্তৃত শহর দেখা যায়। ভেতরে ঢুকলে নিচের দিকে নেমে যাওয়া একটি ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্স আছে। যেখানে জাদুঘর, গ্যালারি, সম্মেলনকক্ষ এবং সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রয়েছে। দেয়ালে ব্যবহূত টাইলস ও অলংকরণে ইসলামি জ্যামিতিক নকশা দেখা যায়। আলো-ব্যবস্থাও পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে, যাতে ভেতরের করিডোরে রহস্যময় পরিবেশ তৈরি হয়।
ভেতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ছোট জাদুঘর, যেখানে ইরানের প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতীকী উপাদান প্রদর্শিত হয়। জাদুঘরে ইরানের ফটোগ্রাফির ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত পুরাতন ক্যামেরা পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়াও এখানে আছে পারস্য স্থাপত্যরীতির বিস্ময় আয়নাঘর। ১২টি আয়না ঘরের রহস্য ও আকর্ষণ বাড়িয়ে তোলে। আছে ১১ হাজার বইয়ের একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার।
আজাদি টাওয়ার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক সমাবেশের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবস, প্রতিবাদ ও উদযাপন এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিপ্লবের আগে এটি রাজতন্ত্রের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল; পরে এটি স্বাধীনতা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে।
তথ্যঋণ : সফরে ইরান, উইকিপিডিয়া ও রেডিও লিবার্টি
এ জাতীয় আরো খবর..