কাজ পেলে পেট ভরে, নয়তো উনুনে জ্বলে না আগুন

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-০১, | ১১:১৬:৩৯ |

বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে কর্মরত মোট শ্রমশক্তির বিপুল অংশই এমন এক বাস্তবতার মধ্যে কাজ করছেন, যেখানে নেই লিখিত নিয়োগপত্র কিংবা চাকরির স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা। এমনকি নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো বা বরখাস্তের সুরক্ষাও নেই।

রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা শ্রমিকের জীবন একই সূত্রে গাঁথা। অনিশ্চয়তার ছায়া সবচেয়ে বেশি পড়ে তাদের সংসারে। সামাজিক নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্যবিমার মতো মৌলিক সুবিধা তাদের কাছে প্রায় অপ্রাপ্য। ফলে অসংখ্য শ্রমিকের জীবন প্রতিদিনই চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যায়। কারওয়ান বাজারে এমনই এক শ্রমিক সেলিম হোসেন। মাথায় এক মণেরও বেশি বোঝা বহন করেই চলে তার জীবন। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তাকে এই কাজ করতে হয়। দেড়-দুই ঘণ্টা পরপর ৩০-৪০ টাকার বিনিময়ে কাজের ডাক পান তিনি।

সেলিম বলেন, ‘কাজ বেশি থাকলে দৈনিক ৫০০-৬০০ টাকা রুজি (আয়) করতে পারি। তবে, কোনো কোনো দিন ২০০-৩০০ টাকায়ও সীমাবদ্ধ থাকে। অল্প টাকায় আসলে কিছুই হয় না। পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতে হয়। অনিয়মিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়। পুঁজি বা অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় পেশাও বদলাতে পারছি না। তাই রোদ-বৃষ্টি হলেও কারওয়ান বাজারের এই কাজের খোঁজেই থাকতে হয়, নয়তো খাবার জোটা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।’

‘অসুস্থ হলেও কাজে বের হতে হয়। কারণ, আয় না হলে খাবার নাই। আসলে আমাদের তো দেখার মতো কেউ নাই’— যোগ করেন তিনি।

 ভোর ৬টায় কোদাল হাতে রাস্তার ধারে এসে বসেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের মো. সোলাইমান। মাটি কাটার কাজ করেন তিনি। দৈনিক মজুরি ৬০০ টাকা। কিন্তু এই কাজও নিয়মিত জোটে না। টানা এক সপ্তাহ ধরে কোনো কাজ পাননি। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, তবু আসে না কোনো কাজের ডাক। সরকারি ছুটি কিংবা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসেও তার জীবনে নেই কোনো বিরতি। কাজ পেলে পেট ভরে, নয়তো উনুনে জ্বলে না আগুন; পরিবার নিয়ে থাকতে হয় আধপেটা বা না খেয়ে।

সোলাইমান এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ঢাকায় থাকছেন। বয়স ৪০ পেরিয়ে যাওয়ায় পেশা বদলের চিন্তা আর করেন না। দিনমজুরির কাজ করেই জীবনের চাকা ঘোরাতে হয় তাকে। মা-বাবা, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সাতজনের সংসার তার। মাসে ১৮-২০ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু প্রতিদিন কাজ না পাওয়ায় চলতে হয় ধারদেনা করে।

নতুনবাজার, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই কাজের জন্য অপেক্ষা করছেন বহু মানুষ। পুরুষের পাশাপাশি রয়েছেন নারীরাও। কারও হাতে কোদাল-টুকরি, কারও হাতে ব্যাগ, আবার কেউ অতিরিক্ত জামা-কাপড় নিয়ে ঘুরছেন— যেন কাজের ডাক এলেই ছুটে যেতে পারেন। প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই এসব শ্রমবাজারে এসে হাজির হন তারা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শ্রমিকের সংখ্যাও। নির্দিষ্ট সময়ে কেউ কাজ পান, আবার কাউকে ফিরতে হয় নিরাশ হয়ে।

প্রতি বছর পয়লা মে গোটা বিশ্বে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। বন্ধ থাকে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আয়োজন হয় নানা কর্মসূচির। কিন্তু ঢাকার ফুটপাত আর শ্রমবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা এসব শ্রমিকের জীবনে সেই দিনেও কোনো ছুটি নেই। বরং অন্য দিনের মতোই কাজের আশায় রাস্তায় নামতে হয় তাদের। অনেকেই জানেন না দিনটির তাৎপর্য।

শ্রমখাত বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে আয়ের অনিশ্চয়তা এখন অনেকটা কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। এই খাতে শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হলো স্থায়ী কর্মসংস্থান না থাকা। ফলে তারা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা দারিদ্র্যকে শুধু স্থায়ীই করে না, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে নিয়ে যায়।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..