মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে একটি আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে সম্মত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এই স্বস্তি আপাতত সাময়িক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ প্রশ্ন উঠছে, যদি যুদ্ধ সত্যিই শেষ হয়, তাহলে জ্বালানির দাম কি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে যাবে?
শনিবার (১৮ এপ্রিল) মার্কিন সংবাদসংস্থা সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর উত্তর হতাশাজনক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরএসএম ইউএস-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাস সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ-পূর্ব দামে ফিরে যাওয়ার আশা করা উচিত নয়।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও বাস্তবে তেল পরিবহন স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। বর্তমানে প্রায় ১২৮টি তেলবাহী জাহাজ সেখানে আটকে আছে, যেগুলোতে প্রায় ১৬ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে। প্রথম ধাপে এই জাহাজগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হবে, এরপর খালি ট্যাংকার ঢুকে পুনরায় তেল বোঝাই করবে। বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ণ সক্ষমতায় পরিবহন স্বাভাবিক হতে অন্তত তিন মাস সময় লাগতে পারে।
যুদ্ধ চলাকালে উৎপাদকরা বিকল্প না পেয়ে তেল গুদামে জমা করেছিল। এখন নতুন উৎপাদনের আগে সেই মজুত থেকেই সরবরাহ শুরু হবে। যদিও গুদাম পুরোপুরি পূর্ণ হয়নি, তবুও অতিরিক্ত মজুত বাজারে সরবরাহ ফিরতে বিলম্ব ঘটাবে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের বহু তেলক্ষেত্র বন্ধ রাখা হয়েছিল। এসব কূপ পুনরায় চালু করা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। হঠাৎ উৎপাদন বাড়ালে কূপের ভেতরের চাপ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, ফলে পুনরায় খননের প্রয়োজন হতে পারে।
তাই ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়াতে হবে, এবং পানি ও গ্যাসের চাপ পুনরায় সমন্বয় করতে হবে যা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি কাজ।
যুদ্ধের কারণে অনেক পরিশোধনাগার, গ্যাস ও তেল উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব মেরামত করতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল দৈনিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন এবং ৩০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে; যার বড় অংশ সৌদি আরব ও ইরাকে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে যুদ্ধ সত্যিই শেষ হয়েছে কিনা এবং ভবিষ্যতে আর কোনো বিঘ্ন ঘটবে কিনা তার ওপর।
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার শান্তির আশা জাগলেও তা ভেস্তে গেছে। ফলে বাজারে সংশয় এখনো প্রবল। যদিও তেলের দাম কিছুটা কমেছে, তবুও ব্রেন্ট ক্রুড এখনো ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে; যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ২০ ডলার বেশি।
তেল পরিবহনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা ও বিমা ব্যয়। যুদ্ধের ঝুঁকির কারণে সামুদ্রিক বিমার খরচ কয়েক হাজার শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
এছাড়া, ইরান এখনো প্রণালিতে চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাইছে। জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট রুট ব্যবহার করতে বলা হয়েছে এবং অনুমতি ছাড়া চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে অনেক শিপিং কোম্পানি এখনো দ্বিধায় রয়েছে। কেউ কেউ ধীরে ধীরে পরিস্থিতি যাচাই করে চলাচল শুরু করতে পারে, তবে পূর্ণ আস্থা ফিরতে সময় লাগবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম কিছুটা কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের আশেপাশে স্থিতিশীল হতে পারে, তবে তার নিচে নামা কঠিন। বর্তমান বাজার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছর শেষে দাম প্রায় ৭৭ ডলারে নামতে পারে। তবে যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে ফিরতে সময় লাগতে পারে ২০২৯ সাল পর্যন্ত।
ঐতিহাসিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালন ৩ ডলারে নামাতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০ ডলারে থাকতে হয়; যা বাজার বিশ্লেষকরা ২০৩০ সালের আগে সম্ভব হবে বলে মনে করছেন না।
ম্যাকোয়ারি গ্রুপের বিজনেস বিশ্লেষক উইজম্যান বলেন, উভয় পক্ষ থেকে ইতিবাচক সংকেত পেলে আমরা অবশ্যই একটি শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হতাম। এই মুহূর্তে বাজারের উত্থানের ওপর ভরসা রাখতে হলে কেবল ট্রাম্পের ওপরই আস্থা রাখতে হবে।
অতএব, সংঘাতের অবসান ঘটলেও তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা সহজ নয়। সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠন, উৎপাদন পুনরায় চালু, অবকাঠামো মেরামত এবং রাজনৈতিক আস্থা; সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাই আপাতত শান্তি এলেও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
এ জাতীয় আরো খবর..