✕

সর্বশেষ :
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ৩ নম্বরে ওঠার হাতছানি বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রাকচাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত বাংলাদেশ রেলওয়েকে ১৮টি কোচের চালান পাঠাল ভারত, থাকছে যে সুবিধা হামলার ভয়ে সৌদি বিনিয়োগ সম্মেলন হাইব্রিড মডেলে করার ভাবনা ক্যান্সারসহ ৭ রোগে আর্থিক সহায়তা পেতে নতুন করে আবেদনের নির্দেশ শিকারিদের ফাঁদে হুমকিতে প্রকৃতির বন্ধু বক সৌদির শোধনাগারে হুতির হামলা, অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ১০৭ ডলার সৌদি আরবের নিরাপত্তায় অবিচল সমর্থনের অঙ্গীকার পাকিস্তানের বেতনের বাইরে ইনফান্তিনো পেলেন ২১ কোটি টাকা, প্রকাশ করেনি ফিফা প্রথম প্রেস ব্রিফিংয়েই স্বামীর সঙ্গে ট্রাম্পকে গুলিয়ে ফেললেন নতুন মার্কিন প্রেস সচিব

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী শেরপুরের ঘাঘড়া লস্কর খানবাড়ি মসজিদ

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২২, | ১৪:২৯:২২ |

সবুজে ঘেরা গ্রাম। মেঠোপথ পেরিয়ে সামনে এগোতেই চোখে পড়ে প্রাচীন এক মসজিদ। চারপাশের আধুনিকতার ভিড়েও স্থাপনাটি যেন ধরে রেখেছে কয়েক শতকের ইতিহাস। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার প্রত্যন্ত হাতিবান্ধা ইউনিয়নের ঘাঘড়া লস্কর খানবাড়ি জামে মসজিদ এভাবেই ২১৮ বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৮০৮ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। মসজিদের দরজার ওপরে থাকা কষ্টিপাথরের ফলকে প্রতিষ্ঠার সাল লেখা ছিল। ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ফলকটি চুরি হয়ে যাওয়ায় এখন সেই ঐতিহাসিক নিদর্শন আর নেই। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ধারণা, মসজিদটি প্রায় ৫০০ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছে।

স্থানীয় ইতিহাস ও প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, আজিমোল্লাহ খান মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। তার নামেই মসজিদটির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস স্থানীয়দের কাছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। আজিমোল্লাহ খান ছিলেন ঘাঘড়া লস্কর খানবাড়ির প্রভাবশালী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের পূর্বপুরুষ। মসজিদ নির্মাণের সঙ্গে তার দুই ছেলে আফজাল খান ও গোলাখ খানের সম্পৃক্ততার কথাও স্থানীয়ভাবে জানা যায়।

মসজিদটির সঙ্গে হিরঙ্গী খান, পালানো খান ও জব্বার খানের মতো ঐতিহাসিক চরিত্রের সম্পর্কের কথাও বিভিন্ন স্থানীয় লেখায় উল্লেখ রয়েছে। তবে তারা কারা ছিলেন কিংবা এই অঞ্চলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। একইভাবে আজিমোল্লাহ খান ও তার পরিবারের পূর্বপুরুষরা কোথা থেকে কীভাবে এই এলাকায় এসেছিলেন, তারও নির্ভরযোগ্য ইতিহাস জানা যায় না।

স্থাপত্যে মোগল আমলের ছাপ

মসজিদটির নির্মাণশৈলী একদিকে ব্যতিক্রমী, অন্যদিকে দৃষ্টিনন্দন। স্থানীয়দের দাবি, স্থাপনার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখে ধারণা করা হয়, মোগল আমলের শেষভাগে বক্সার বিদ্রোহী নেতা হিরঙ্গী খানের সময়কালে এটি নির্মিত হয়েছিল।

এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির মূল ভবন প্রায় ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের। মাঝের বড় গম্বুজকে ঘিরে রয়েছে ছোট-বড় ১০টি মিনার। উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে দুটি জানালা। পূর্ব দিকে রয়েছে একটি প্রবেশদ্বার।

মসজিদের ভেতরে দুটি খিলান ও একটি মেহরাব রয়েছে। দেয়ালজুড়ে ফুল, ফুলদানি ও বিভিন্ন নকশার কারুকাজ দেখা যায়। প্রায় চার ফুট পুরু দেয়াল চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত। মূল ভবনের ভেতরে তিন কাতারে প্রায় ৩০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। খোলা বারান্দা ও চত্বরে আরও প্রায় ১০০ জনের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

একসময় মসজিদের ভেতরের কারুকাজে ছিল নানা রঙের ব্যবহার। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংস্কারকাজে পুরো মসজিদ সাদা রঙে রাঙানো হয়েছে। এতে পুরোনো কারুকাজের অনেকটাই অস্পষ্ট হয়ে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

মসজিদ ঘিরে আবেগ, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় চর্চা

শত শত বছর ধরে এই মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয়ে আসছে। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আবেগেরও অংশ।

মসজিদের নামে খান পরিবারের ৫৮ শতাংশ জমি ওয়াকফ করা রয়েছে। এর মধ্যে ১৭ শতাংশ জমির ওপর মূল মসজিদ ভবন এবং ৪১ শতাংশ জমিতে রয়েছে কবরস্থান। মসজিদের নামে রয়েছে দুটি পুকুরও। পুকুরের আয় থেকে মসজিদের বিভিন্ন খরচ বহন করা হয়।

দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ প্রাচীন এই মসজিদ দেখতে আসেন। অনেক দর্শনার্থী এখানে নামাজও আদায় করেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, শত বছরের পুরোনো এই মসজিদে ইবাদত করলে এক ধরনের বিশেষ আধ্যাত্মিক অনুভূতি পাওয়া যায়।

পর্যটনের সম্ভাবনা

শেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে ঘাঘড়া গ্রাম। কয়রোড সড়ক থেকে পশ্চিম দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার মেঠোপথ পাড়ি দিলেই সবুজ মাঠের মধ্যে দেখা মেলে প্রাচীন এই মসজিদের। পাশেই রয়েছে দুটি পুকুর। পুরো পরিবেশটি একদিকে যেমন শান্ত, অন্যদিকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আবহে অনন্য।

তবে এত পুরোনো ও ঐতিহাসিক স্থাপনা হলেও এর সংরক্ষণ ও সংস্কারে তেমন উদ্যোগ নেই বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিশেষ করে মসজিদে যাওয়ার রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল। ফলে দর্শনার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও খান পরিবারের সদস্য রাজা মিয়া বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটির খোঁজখবর রাখে। তবে মসজিদে যাওয়ার রাস্তাটি সংস্কার করা জরুরি। রাস্তাটি ভালো হলে দূর-দূরান্ত থেকে আরও বেশি মানুষ এখানে আসতে পারবেন।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, ঘাঘড়া লস্কর খানবাড়ি জামে মসজিদ এ এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবেগের স্থান। এলাকার মানুষ শত বছর ধরে মসজিদটি আগলে রেখেছেন। বর্তমানে স্থাপনাটি সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মসজিদে যাতায়াতের রাস্তার অবস্থা ভালো নয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত রাস্তাটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা হলে ২১৮ বছরের পুরোনো ঘাঘড়া লস্কর খানবাড়ি জামে মসজিদ শেরপুরের অন্যতম দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে আরও পরিচিতি পাবে। একই সঙ্গে প্রাচীন এই স্থাপনাকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..