✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৪, | ১০:১১:৪৫ |সুন্দরবনে বনরক্ষীদের নিয়মিত ফুট পেট্রোলিং, স্মার্ট পেট্রোলিং, বোট পেট্রোলিংসহ দিন-রাত ঝটিকা অভিযান ও আধুনিক ড্রোন উড়িয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে বনজ সম্পদ ধ্বংসকারী চক্র ও চোর শিকারিদের অপতৎপরতা। কমেছে হরিণসহ বন্যপ্রণী শিকার ও বিষ দিয়ে মাছ ধারা। এই অবস্থায় এখন সুন্দরবন সন্নিহিত লোকালয়ে দুই হাজার টাকা কেজিতেও মিলছে না হরিণের মাংস। পাল্টে গেছে সেই চিরচেনা চিত্র, প্রাণ ফিরেছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে।
শুধু সুন্দরবন বিভাগের পরিসংখ্যান নয়, মাঠ পর্যায়ে খোজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ মাস আগে সুন্দরবন সন্নিহিত লোকালয়ে গরু বা খাসির মাংসের তুলনায় কম দামে বিক্রি হত হরিণের মাংস। এমনকি চামড়াসহ হরিণ নিয়ে শহরের ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করত চোরা শিকারিরা। এখন পাল্টে গেছে সেই চিরচেনা চিত্র। সুন্দরবন সন্নিহিত লোকালয়ে দুই হাজার টাকা কেজিতেও মিলছে না হরিণের মাংস। বনরক্ষীদের কঠোর তৎপরতায় বন অপরাধীদের দৌরাত্ম্য এখন নিয়ন্ত্রণে।
বিগত বছরের তুলনায় চলতি বছর সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে বিষ দিয়ে মাছ শিকার, বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে হরিণ শিকার কমে এসেছে। চলতি বছর সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ তিন মাসের মধ্যে জুন, জুলাই ও ১৩ আগস্ট পর্যন্ত পূর্ব সুন্দরবনে বনরক্ষীদের তৎপরতায় অপরাধ অনেক কমেছে। এই সময়ের মধ্যে বনরক্ষীরা ৩ হাজার ২১৪টি অভিযান চালিয়ে ৪টি মামলা (ইউডিওআর) দায়ের করেন। উদ্ধার করে অসাধু চক্রের ব্যবহৃত ১৩টি নৌকা, ৬টি মাছ ধরার জাল এবং ৩২ বোতল, ২ লিটার তরল ও ৩ প্যাকেটজাত বিষ, ১৫১ দশমিক ৫ কেজি বিষযুক্ত চিংড়ি এবং ২ বস্তা শুঁটকি চিংড়ি ও ৫ কেজি শুঁটকি মাছ। অথচ গত বছরে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত (২০২৫) অভিযানে ৮টি মামলায় ৫ জন আসামিকে গ্রেফতার করে। সে সময় ২৭টি নৌকা, ২১টি জাল, ৫২ বোতল ও ৫ লিটার বিষ, ২৪৫ কেজি বিষযুক্ত মাছ, ১৪৫ কেজি বিষযুক্ত চিংড়ি, ১৭৭ কেজি সাদা মাছ এবং ২২ বস্তা শুঁটকি চিংড়ি উদ্ধার করা হয়েছিল।
অপরদিকে, চলতি বছর সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ তিন মাসের মধ্যে জুন, জুলাই ও ১৩ আগস্ট পর্যন্ত পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে হরিণ শিকার রোধেও বড় ধরণের সফলতা এসেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট এই ৬ মাসের সাথে গত বছরের একই সময়ের চিত্রে তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। চলতি বছরের মার্চ হতে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫ মাসে ৯ জন শিকারিকে গ্রেফতার করে ৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সময়ে কোনো হরিণের মাংস, চামড়া বা মৃত হরিণ উদ্ধার হয়নি। একই সময়ে জব্দ করা হয়েছে হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা ১৪ হাজার ৩৮১ ফুট মালা ফাঁদ, ১১০টি ছিটকা ফাঁদ, ৪৬ ফুট হাটা ফাঁদ ও ৬৯টি ডোয়া ফাঁদ। পাশাপাশি ২টি নৌকা ও ৩টি ট্রলারও আটক করা হয়।
অথচ গত বছরে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত (২০২৫) পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে ২০টি মামলায় ১২ জন শিকারিকে গ্রেফতার তরা হয়। তখন ১৫৬ দশমিক ৫ কেজি হরিণের মাংস, ৫টি মাথা, ৮টি পা, ২টি চামড়া ও ২টি মৃত হরিণ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ওই সময়ে ফাঁদের পরিমাণও ছিল বহুগুণ বেশি। উদ্ধার কারা ফাঁদের মধ্যে ছিল ৩৩ হাজার ৭০৩ ফুট মালা ফাঁদ, ২৫৮টি ছিটকা ফাঁদ, ১ হাজার ৫০৫ ফুট হাটা ফাঁদ ও ২৫ ফুট গলা ফাঁদ এবং ৯টি নৌকা ও ৬টি ট্রলার জব্দ করা হয়।
সুন্দরবন সুরক্ষায় সন্নিহিত পাচ জেলার সাংবাদিকদের সংগঠন সুন্দরবন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মনিরুজ্জামান নাসিম আলী জানান, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আগের চেয়ে ভালো আছে। বিশেষ করে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বনাঞ্চল গত এক বছরের অধিক সময়ে সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকায় বন অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে করেছে। পাল্টে গেছে সুন্দরবনের সেই চিরচেনা চিত্র। বনজ সম্পদ ধ্বংসকারী চক্র বিশেষ করে চোর শিকারি ও বিষ দিয়ে মাছ ধারা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর পূর্ব সুন্দরবন সন্নিহিত লোকালয়ে মিলছে না হরিণের মাংস। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের মতো পশ্চিম বিভাগেরও সার্বক্ষণিক নিবিড় নজরদারিতে আনাতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত বনরক্ষীদের শূন্য পদ পূরণ, দ্রুতগতির নৌযানের ব্যবস্থা, আরো অধিক ড্রোন, জেলে-বনজীবীদের নৌযানে জিপিএস ট্রাকিংয়ের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার ও প্রযুক্তি নির্ভর। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে দুর্গম বনাঞ্চলে বনরক্ষীরা নিয়মিত ফুট পেট্রোলিং, স্মার্ট পেট্রোলিং, বোট পেট্রোলিংসহ দিন-রাত ঝটিকা অভিযান ও আধুনিক ড্রোন উড়িয়ে নিবিড় নজরদারি পরিচালনা করছি। প্রায় ১৫ মাসের এসব অভিযানের ফলেই হরিণ শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী অসাধু চক্রের তৎপরতা অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। সুন্দরবনে অপরাধের এই নিম্নমুখী ধারা ধরে রাখতে তিন মাস প্রবেশ নিষিদ্ধ সময়ের পর ১ সেপ্টেম্বও থেকে আমাদের আরো কঠোর অভিযান ও আধুনিক নজরদারি অব্যাহত থাকতে হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।