চলতি বছরের সবচেয়ে উষ্ণতম জুন-জুলাই মাস পার করেছে পশ্চিম ইউরোপ। অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের কারণে সৃষ্ট দাবানল ভূমধ্যসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এবারের তাপপ্রবাহ বড় আঘাত হেনেছে ইউরোপের অর্থনীতিতে।
তাপ ও খরা তীব্র হওয়ায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নৌপরিবহন এবং জনস্বাস্থ্যে। এ বছরের দাবানল ইউরোপের সর্বকালের বেশি ভয়াবহ হিসেবে রেকর্ড গড়েছে।
রয়টার্স ও আল জাজিরা বলছে, এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে তাপপ্রবাহের ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যেই শত শত বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে। দ্রুতগতিতে বাড়ছে জীবনযাপনের খরচ।
অন্য যেকোনো মহাদেশের তুলনায় ইউরোপে জলবায়ু দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ক্ষয়ক্ষতি সরকারি অর্থায়নের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। মুদ্রাস্ফীতির ব্যাপক ওঠানামা ঘটাচ্ছে। পর্যটনের মানচিত্র নতুন করে আঁকতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পণ্য পরিবহণের পদ্ধতি নিয়েও নতুন কর্মপরিকল্পনা সাজাতে হচ্ছে।
জার্মানির ম্যানহাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সেহরিশ উসমান বলেন, বিরূপ তাপপ্রবাহ অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপকে আঘাত করেছে। তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানল একই সময়ে এবং একই অঞ্চলে ঘটছে। ফলে দ্বিগুণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সর্বশেষ খবর মতে স্পেনে দাবানল সক্রিয় রয়েছে। রয়টার্স বলছে, চলতি বছর স্পেনে ইতোমধ্যে প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমি পুড়েছে। যুক্তরাজ্যেও বেশ কয়েকটি দাবানল চলছে। দেশটির নিউ ফরেস্টে বড় আগুনে পুড়ে গেছে ১.৬ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা।
বৃহত্তর ইউরোপীয় ইউনিয়নে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ৫ লাখ ৪২ হাজার ৯২৬ হেক্টর এলাকা দাবানলে পুড়েছে। দেশগুলোতে ১ হাজার ৫৯৯টি দাবানল শনাক্ত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় এটি অনেক বেশি। তাছাড়া ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস, ইতালি ও পর্তুগালসহ দক্ষিণ ইউরোপের বিভিন্ন অংশে খরা ও তীব্র গরমে দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে।
তাপপ্রবাহে রেকর্ড অর্থনৈতিক ক্ষতি
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জুন ও জুলাই মাসে তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁয়েছে এবং এর অর্থনৈতিক ক্ষতি আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইউরোপে পণ্য পরিবহণের প্রধান পথ রাইন ও দানিউব নদীতে পানির স্তর কমে গিয়ে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
গরমে শীতলীকরণ ব্যবস্থায় সমস্যার কারণে অর্ধ ডজনেরও বেশি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে বা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কৃষি উৎপাদনের পূর্বাভাস হ্রাস পেয়েছে। ভুট্টা ও সূর্যমুখীর মতো দেরিতে কাটা ফসল জুলাই মাসেই ৬-৭ শতাংশ ক্ষতির শিকার হয়েছে। শুধু জার্মানিতেই তাপজনিত কারণে দশ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক ও আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান আইএনজির মতে, শুধু রাইন নদীতে যান চলাচল বন্ধ থাকার কারণেই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানির জিডিপি এই বছর ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট কমে যাবে।
অন্যদিকে হাঙ্গেরির এমবিএইচ ব্যাংক মনে করছে, দেশটির বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রতি সপ্তাহে বন্ধ থাকার কারণে জিডিপিতে ০.১ শতাংশ পয়েন্টের ক্ষতি হবে।
জার্মান বীমা সংস্থা অ্যালিয়ান্সের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুনের দুই সপ্তাহের তাপপ্রবাহই ইউরোপের জিডিপি ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে দেবে। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালির মতো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি ৫-৭% কমে যাবে।
আলিয়ান্সের অর্থনীতিবিদ হাজেম ক্রিচেন বলছেন, এই বছরের মোট ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে। এই সংকটসহ নানা কারণে এ বছর ইউরো জোনের প্রবৃদ্ধি মাত্র এক শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এমনকি অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব বেশ কয়েক বছর ধরে থাকবে।
আইএনজির অর্থনীতিবিদ কার্স্টেন ব্রজেস্কি মনে করেন, তীব্র তাপমাত্রায় দক্ষিণ ইতালি বা স্পেনে পর্যটকদের দেখা মিলছে না। এ কারণেগ্রীষ্মকালীন পর্যটকদের আনাগোনা কমে যাবে। পর্যটকরা উত্তরের দিকে চলে যাবে, যা দক্ষিণের পর্যটনে প্রভাব ফেলবে। খাদ্যের দাম বাড়বে।
জুলাই মাসে রেকর্ড সামুদ্রিক তাপমাত্রা
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জুলাই মাসে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে রেকর্ড গড়েছে। আগের যে কোনো জুলাইয়ের চেয়ে তা বেশি। পশ্চিম ইউরোপে বিধ্বংসী তাপপ্রবাহ আঘাত হানার ফলেই এটা হয়েছে।
ইইউর কোপারনিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবা জানিয়েছে, আটলান্টিক উপকূল ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে জুলাই মাসের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর প্রভাব ইউরোপের সমুদ্রেও পড়ছে। বিশ্বব্যাপী শীতল মেরু অঞ্চলের বাইরে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা এই মাসের জন্য রেকর্ড সর্বোচ্চ ছিল।
কোপার্নিকাস সোমবার জানিয়েছে, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের প্রথম দুটি মাস স্বাভাবিকের চেয়ে ২.৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ ছিল, যা চার বছর আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। মধ্য ইউরোপ তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়েছে। অস্ট্রিয়া, স্লোভাকিয়াসহ কয়েকটি দেশে জাতীয় তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে। ফলে তাপে গাছপালা শুকিয়ে দাবানলের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
গার্ডিয়ান জানায়, গত জুনের শেষের দিকের তীব্র গরমে ইউরোপে ১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তীব্র খরায় ইউরোপের প্রধান নদীগুলো বিশেষ করে সেন, রাইন এবং দানিউবের পানির স্তর নেমে গেছে, যা মহাকাশ থেকেও স্পষ্ট হচ্ছে।
ইউরোপীয় বন অগ্নিকাণ্ড তথ্য ব্যবস্থার তথ্যমতে, বছরের শুরু থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে। গরম, শুষ্ক এবং ঝড়ো হাওয়ার পরিস্থিতিতে দাবানল আরো বেপরোয়া হয়েছে।
ইইউর প্রতিবেদন অনুসারে, এবারের তাপপ্রবাহে ইউরোপে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ১২.৩ লাখ একরেরও বেশি জমি পুড়ে গেছে। জমিগুলোর বেশিরভাগই স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালিতে অবস্থিত।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে যা মিলল
লেইডা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন প্রকৌশলের অধ্যাপক ভিক্টর রেস্কো দে দিওস সংকট মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন নগর পরিকল্পনার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টের জলবায়ুবিষয়ক কৌশলগত প্রধান সামান্থা বার্জেসের মতে, জুন ও জুলাই মাসের তীব্র তাপমাত্রা এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা মিলে একটি উষ্ণ আবহাওয়ার চক্র তৈরি করেছে। তিনি বলেন, খরায় মাটি শুকিয়ে হারাচ্ছে প্রাকৃতিক শীতলতা।
কোপারনিকাস অ্যাটমোস্ফিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের পরিচালক লরেন্স রুইল বলেন, দাবানলে মহাদেশজুড়ে কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়েছে, যাতে বায়ুর গুণমান বিঘ্নিত হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স, গার্ডিয়ান ও আল জাজিরা
এ জাতীয় আরো খবর..