১৮ শিক্ষকের মাদরাসায় ১৬ পরীক্ষার্থী, সবাই ফেল

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১২, | ১০:০৯:৩০ |

নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার পাটুলী ইউনিয়নের সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদরাসায় শিক্ষক রয়েছেন ১৮ জন। অথচ ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় এ প্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেওয়া ১৬ জন পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি। এমন ফলাফলে অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা ও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

জানা গেছে, ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটি পরবর্তীতে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১৮ জন শিক্ষক কর্মরত। ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় ৭ জন ছাত্রী ও ৯ জন ছাত্র অংশ নেয়। তবে তাদের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। আগামী ২০২৭ সালের দাখিল পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

মঙ্গলবার সরেজমিনে মাদরাসায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে মোট শিক্ষার্থী প্রায় ২০০ জন। তবে নবম, দশম শ্রেণি ও প্রাথমিক শাখা মিলিয়ে উপস্থিত রয়েছে মাত্র ২০ জনের মতো। শিক্ষার্থী সংকটের কারণে একটি কক্ষেই দুই শ্রেণির পাঠদান করতে দেখা যায়। মোট ১০টি শ্রেণিকক্ষ থাকলেও বেশ কয়েকটি জরাজীর্ণ। কোনো কোনো কক্ষে ভাঙাচোরা টিনের স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান না করানোয় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের এমন অবস্থা চললেও কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানোর পরও কার্যকর কোনো পরিবর্তন হয়নি।

দাখিলে অকৃতকার্য শিক্ষার্থী সিয়ামের বাবা বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘এই মাদরাসায় কোনো শিক্ষক পড়ালেখা করান না। শিক্ষকরা গল্প করেন, যার যার মতো চলে যান। আমার এমনিতেই অর্থ সংকট। গত বছর আমার ছেলেকে পরীক্ষা দিয়েছিলাম, দুই বিষয়ে ফেল করেছিল। এ বছর আবার পরীক্ষা দিয়েছে, এবারও ফেল করেছে। আমরা বারবার অভিযোগ করেছি, কিন্তু তাঁরা আমাদের কথা গুরুত্ব দেননি। আমরা এর পরিবর্তন চাই। প্রায় ২০ বছর ধরে মাদরাসার এই অবস্থা।’

মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী তৌহিদ বলেন, ‘আমি ২০০৭ সালে এই মাদরাসা থেকে পড়াশোনা শেষ করেছি। তখন খুব জমজমাট ছিল। বর্তমানে রেজাল্টের দিক দিয়েও খারাপ, ছাত্রছাত্রীও নেই। প্রতি ক্লাসে একজন-দুজন পাওয়া যায়। শিক্ষকরা বসে থাকেন, আড্ডা দেন। পরিচালনাও ঠিক নেই। ১৬ জন পরীক্ষা দিয়েছে, একজনও পাস করেনি, অথচ শিক্ষক আছেন ১৮ জন।’

স্থানীয় বাসিন্দা তৌফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘একটা মাদরাসায় যদি ১৬ জনের মধ্যে ১৬ জনই ফেল করে, তাহলে এটা লজ্জার বিষয়। শিক্ষক ১৮ জন থাকতে ১৬ জন শিক্ষার্থী কীভাবে ফেল করে? পড়াশোনার ব্যবস্থা ভালো নয়। তাঁদের এবার শিক্ষা হওয়া উচিত।’

তবে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, পড়ালেখার অব্যবস্থাপনা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে শিক্ষকরা পাঠদান করতে সমস্যায় পড়ছেন। জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

মাদরাসার প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমি এই ফলাফলে নিজেই হতভম্ব। আমার বলার মতো ভাষা নেই। যারা ফেল করেছে, কী কারণে ফেল করেছে, তাদের খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ভেতরে কী সমস্যা, তা দেখব। সকল শিক্ষার্থীর একসঙ্গে ধস নামার কথা নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ক্লাস কীভাবে নেব, আমার তো শ্রেণিকক্ষই ঠিক নেই। ৪০ বছরের প্রতিষ্ঠানে সরকারের কোনো ছোঁয়া নেই। দুইটা রুম দিয়ে আমার নয়টি ক্লাস চলে। সামনে বছর আমি ১০০ শতাংশ পাস করব, কথা দিলাম। এ জন্য সব ধরনের চেষ্টা করছি।’

বেলাবো উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম ফারুক বলেন, ‘আমরা মাদরাসায় চিঠি পাঠাব, এই অবস্থা কেন হলো। প্রতিষ্ঠান প্রধানকে এই বিপর্যয়ের কারণ এবং কীভাবে উত্তরণ করা যাবে, তা ব্যাখ্যা করতে বলা হবে। তাঁদের বক্তব্য শুনে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শিক্ষকদের পক্ষ থেকে পড়াশোনার পরিবেশ ভালো না থাকাকে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘গাছতলায় লেখাপড়া করলেও পাঁচ-সাতজন পাস করবে। ভবন সংস্কারের জন্য আমি কথা বলব। কিন্তু শতভাগ ফেল করবে, তা মানা যায় না। তারা বেশির ভাগ বাংলা ও ইতিহাস বিষয়ে ফেল করেছে।’

১৬ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করায় মাদরাসাটির শিক্ষা কার্যক্রম, পাঠদানের পরিবেশ এবং শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগামী বছর প্রতিষ্ঠানটির ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হবে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..