ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এক যুগেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে চলেছে। টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকার পর বড় পরাজয়ের মুখে তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের পথে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় যাচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারেও ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।
এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, ভোটার আচরণ, প্রশাসনিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক কৌশল — সব মিলিয়ে বদলে গেছে রাজনীতির চিত্র।
নারী ভোটে বড় ধাক্কা
পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি নারী। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেস এই ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করেই নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি নারীদের কাছে দলটিকে জনপ্রিয় করেছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই সমর্থনে স্পষ্ট ভাটা পড়েছে।
বিশেষ করে নারী নিরাপত্তা নিয়ে অসন্তোষ বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। দুই বছর আগের আরজিকর আন্দোলন এবারের ভোটে প্রভাব ফেলেছে। যার বড় প্রমাণ - পানিহাটির মতো তৃণমুলের শক্ত ঘাঁটিতেও আরজিকর নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে এগিয়ে রয়েছেন।
ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। এতে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ে। এর মধ্যে যেমন ভুয়া বা মৃত ভোটার ছিলেন, তেমনি অনেক বৈধ ভোটারও বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের সম্ভাব্য ভোটারদের একটি অংশ বাদ পড়ায় নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব পড়েছে।
দীর্ঘদিনের শাসনে জমা ক্ষোভ
টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ জমে ওঠে। কাটমানি, সিন্ডিকেট ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এই ক্ষোভই ভোটের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ভোটের সমীকরণে বড় পরিবর্তন
সাম্প্রদায়িক সমীকরণের দিক থেকে রাজ্যের ভোটের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এতদিন প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটের ৮০-৯০ ভাগই তৃণমূলের পক্ষে ছিল, কিন্তু এবার তার বিপরীতে প্রায় ৬৫ শতাংশ হিন্দু ভোটের একটি বড় অংশ একদিকে একত্রিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে বিজেপি উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয়েছে। এমনকি মুসলিম ভোটও বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে যাওয়ায় মুসলিম অধ্যুষিত কিছু এলাকাতেও বিজেপি ভালো ফল করতে শুরু করেছে।
নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন
নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে এবারে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ব্যবস্থায় সাধারণত রাজ্যের শাসক দল কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়ে এসেছে এতদিন, কিন্তু এবার তা হয়নি। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্য প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রশাসন ও পুলিশের উচ্চ পর্যায়ে অনেক অদলবদল হয়েছে।
এর বাইরে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ২ লাখ ৪০ হাজারের মতো সদস্য মোতায়েন করা হয় নির্বাচন উপলক্ষে। এতে ভোট তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ হয়েছে, সাধারণ ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন। কিন্তু এতে শাসক দলের প্রভাব কমে গেছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, ১৫ বছরের রাজ্য শাসক দল হিসেবে তৃণমূল বাড়তি সুবিধা নিতে পারেনি, কিন্তু কেন্দ্রের শাসক দল হিসেবে কিছু সুবিধা বিজেপি পেয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর..