টানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় ফের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টার পর শুরু হওয়া বৃষ্টিতে নগরের নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে গিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রবর্তক মোড়সহ আশপাশের এলাকায় কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন এসএসসি পরীক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীসহ জরুরি সেবাগ্রহীতারা।
নগরের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস দুপুর ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। একই সময়ে আমবাগান আবহাওয়া অফিস ৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। মূলত শহরের প্রাণকেন্দ্র আমবাগান আবহাওয়া অফিসের রেকর্ড করা বৃষ্টিই শহরের পরিস্থিতির চিত্র ফুটে ওঠে।
সরেজমিন দেখা গেছে, প্রবর্তক মোড়ের অদূরে বদনা শাহ মাজার সংলগ্ন প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে বহু যানবাহন মাঝরাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। কোথাও কোমরসমান আবার কোথাও গলাসমান পানি মাড়িয়ে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেক পথচারীকে উঁচু রোড ডিভাইডারের ওপর দিয়ে হেঁটে চলাচল করতে দেখা গেছে।
আবার রিকশার সিটসম পানি হওয়ায় অনেকে সিটের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন, বুকসমান পানির মধ্যে রিকশাচালক রিকশা টানছেন।
এলাকাটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও একাধিক বেসরকারি রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের কেন্দ্রস্থল হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুল্যান্স চলাচলেও ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রবর্তক মোড়ের হিজড়া খালের কালভার্ট এলাকায় মাটি ফেলে সংস্কারকাজ চলায় এবং যন্ত্রপাতির স্তূপ করে রাখায় পানি নামতে পারছে না। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের ধীরগতির কারণেই আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় সাময়িকভাবে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে।
এ ছাড়া তিনপুল এলাকায় সড়কের ওপর কোমর পরিমাণ পানি ছিল। সড়কের পাশে পার্কিং করা মোটরসাইকেলগুলো খেলনার মতো ভাসতে দেখা গেছে। ডবলমুরিং থানার পশ্চিমে রূপসা বেকারি মোড়েও ছিল হাঁটু পরিমাণ পানি। এ ছাড়া মুরাদপুর, শুলকবহর, বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ আবাসিক, জামালখান বাইলেন, ইপিজেড, অক্সিজেন মোড়সহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। বেশ কিছু এলাকার বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও পানি ঢুকে পড়ার খবর পাওয়া গেছে যেগুলো তুলনামূলক নিচু এলাকা।
আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নগরের জলাবদ্ধতা কমাতে গত সপ্তাহ থেকেই মাসব্যাপী খাল-নালা পরিষ্কার অভিযান শুরু করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। মঙ্গলবার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনকালে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নগরের নালা-নর্দমা ময়লার স্তূপে পরিণত হওয়াই জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ। কিছু অসচেতন ব্যবসায়ী ও বাসিন্দার কারণে নালাগুলো বর্জ্য ফেলার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জনগণ সচেতন না হলে কোনো সরকারি উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।’
বর্তমানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) মেগা প্রকল্পের আওতায় নগরের ৩৬টি খাল সংস্কারের কাজ করছে। তবে হিজড়া খাল ও জামালখান খালের কাজ এখনো শেষ না হওয়ায় ভোগান্তি কাটছে না।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘সিডিএর আওতাধীন খাল সংস্কার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। বিশেষ করে হিজরা খাল ও জামালখান খালের সংস্কার কাজ চলমান থাকায় কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে, যার ফলে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। এসব উন্নয়ন কাজ চলমান থাকার কারণে সাময়িক দুর্ভোগ তৈরি হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
মেয়র আরো বলেন, “আগামী ১৫ মে’র মধ্যে সিডিএর খাল সংস্কার কাজ সম্পূর্ণ শেষ হবে। কাজ শেষ হলে চলমান বর্ষা মৌসুমেই নগরীর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
এ জাতীয় আরো খবর..