বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আগামী কয়েক মাসে আরো বাড়তে পারে। ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত দাম বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
খাদ্য সরবরাহে নানা সমস্যা, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, যুদ্ধ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে ইউক্রেনের বাজারেও।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে খাদ্য সরবরাহ নিয়ে একাধিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে শস্য পরিবহনের অবকাঠামোতে হামলার কারণে গম সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় কিছু জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে।
একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানিও ব্যাহত হয়েছে। ফলে ফসল উৎপাদন, কাটা ও বাজারে পৌঁছে দেওয়ার খরচ বাড়ছে।
এ ছাড়া আবহাওয়ার পরিবর্তনও খাদ্য উৎপাদনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এল নিনোর প্রভাবে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে খরা আরো তীব্র হতে পারে। এতে গম, চালসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে গমের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এশিয়ার প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। এসব দেশে চালের মজুত পর্যাপ্ত থাকার পরও দাম বেড়েছে।
আগে শস্যের বড় মজুদ ও ভালো ফলনের কারণে সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলেও বাজারে তার প্রভাব কিছুটা কমানো যেত। কিন্তু এখন সেই সুযোগ কমে আসছে। স্থানীয়ভাবে ভালো ফলনের কারণে যেসব বড় আমদানিকারক দেশ আগে বিশ্ববাজার থেকে পণ্য কেনা কমিয়েছিল, তারা আবার কেনাকাটা শুরু করতে পারে। এতে চাহিদা বাড়বে এবং দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো সতর্ক করে বলেছেন, ২০২৬ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৭ সালের শুরুর দিকে খাদ্যবাজারে চাপ আরো বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতি পুরো ২০২৭ সালজুড়েও চলতে পারে।
তার মতে, আগের মজুত ও ভালো ফলন এত দিন বাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু সেই সুরক্ষা এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পথে পণ্য পরিবহনের খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
কাঁচামালের দাম বাড়ায় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও চাপে রয়েছে। বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি জ্বালানি, পরিবহন ও শ্রমিকের খরচও বাড়ছে। এসব বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর পড়তে পারে।
বিশ্ববাজারের পাশাপাশি ইউক্রেনেও পণ্যের দাম বাড়ছে। তবে সব পণ্যের দাম একই হারে বাড়ছে না। ইউক্রেনের সরকারি পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আগস্টের তুলনায় দেশটিতে ভোক্তাপণ্যের দাম ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরে খাদ্যপণ্য ও কোমল পানীয়ের দাম আগের মাসের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এ সময় ডিমের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। তবে ফল ও সবজির দাম কমেছে।
দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রতি কেজি বাকউইটের গড় দাম বেড়ে ৮০ দশমিক ৯৫ হৃভনিয়ায় দাঁড়িয়েছে। সেদ্ধ চালের দাম বেড়ে হয়েছে প্রতি কেজি ৬১ দশমিক ৩৭ হৃভনিয়া। অন্যদিকে, কাউনের দাম কমে প্রতি কেজি ৫৬ দশমিক ২০ হৃভনিয়ায় নেমেছে। ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম গ্লাভকম এ তথ্য জানিয়েছে।
ইউরোপে সরবরাহের ঘাটতির কারণে ইউক্রেনে বিভিন্ন ধরনের বেরির দামও বাড়ছে। এ ছাড়া দেশটিতে উৎপাদিত টমেটোর পাইকারি দাম বেড়েছে। রাজধানীর পাইকারি বাজারে লাল, গোলাপি ও মাটিতে উৎপাদিত টমেটোর দাম বেড়েছে।
ইউক্রেনে খাদ্যপণ্যের দাম আগামী দিনে কতটা বাড়বে, তা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। এর মধ্যে রয়েছে ফসলের ফলন, দেশের ভেতরে পণ্য সরবরাহ, উৎপাদন খরচ ও পরিবহনব্যবস্থা। বিশ্ববাজারে শস্য ও তেলবীজের দামও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ ছাড়া জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সারের দাম বাড়লে ইউক্রেনের কৃষকদের উৎপাদন খরচ আরো বেড়ে যেতে পারে। ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তিত হলেও আমদানি করা পণ্য এবং বিদেশি কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন কত দিন থাকে এবং প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে আবহাওয়া কেমন থাকে, তার ওপরও বাজারের পরিস্থিতি নির্ভর করবে। নতুন ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়া মজুতের ঘাটতি পূরণ করতে না পারলে দাম আরো বাড়তে পারে।
একই সময়ে বড় আমদানিকারক দেশগুলো বিশ্ববাজারে ফিরে এসে শস্য কেনা বাড়ালে চাহিদার ওপর চাপ তৈরি হবে। এতে খাদ্যপণ্যের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর..