✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-১১, | ১৫:৫৬:২৬ |শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের মধ্যেই তিনটি স্থানে দেখা দিয়েছে ভাঙন। গত বছর ২০২৫ সালে প্রায় ৩০০ মিটার এবং চলতি বছরের আগস্টে আরও অন্তত ২০০ মিটার বাঁধ নদীতে বিলীন হয়েছে। দুই বছরে ভাঙনের শিকার হয়ে অন্তত ৩০০ পরিবার বসতবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও প্রায় ৫০০ পরিবারের ঘরবাড়ি। এতে আতঙ্কে দিন কাটছে নদীতীরের বাসিন্দাদের।
পদ্মার ভাঙনে এরই মধ্যে পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া, ফরাজীকান্দি ও নাওডোবা ইউনিয়নের পৈলান মোল্যারকান্দি ও আলম খারকান্দি এলাকায় প্রায় ৭০টি দোকান, একটি মসজিদ এবং গ্রামীণ সড়কের প্রায় ৯০ মিটার অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই দুই বছর ধরে স্থায়ী ঠিকানা হারিয়ে ভাড়া বাড়িতে কিংবা স্বজনদের আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের দাবি, দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু এলাকার নাওডোবা থেকে জাজিরা ইউনিয়নের পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত পদ্মার দক্ষিণ তীরে ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। ৩৯টি প্যাকেজে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের মার্চে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের জিরো পয়েন্ট থেকে পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু হয়।
২০২৫ সালে প্রকল্পের একটি অংশে ভাঙন দেখা দিলে নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। পরে প্রকল্পের সঙ্গে আরও দুই কিলোমিটার অংশ যুক্ত করা হয়। কিন্তু নকশা পরিবর্তন ও কাজ চলার পরও চলতি বছর নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে মাত্র দুই দিনে কাথুরিয়া-মাঝিরঘাট সড়কের প্রায় ৫০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এতে ওই সড়ক দিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের তিনটি খুঁটি তারসহ নদীতে পড়ে গেছে। বন্ধ রয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। ভাঙনের আতঙ্কে নদীর তীরের বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ও দোকান সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকে বাড়ির গাছপালাও কেটে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।
কাথুরিয়া গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী রাহিমা বেগমের চার শতক জমির বসতবাড়ি আগস্টের প্রথম সপ্তাহে পদ্মায় বিলীন হয়েছে। ১৮ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বসবাস করতেন তিনি। এখন সেই আশ্রয়ও নেই। বাড়ির মালামাল সরানোর সময় আহাজারি করে রাহিমা বেগম বলেন, ‘পরিবারে আয় করার মতো কেউ নাই। ঢাকায় হকারি কইরা কাপড় বিক্রি করি। বাড়ি ভাইঙা নিতে এলাকায় আইছি।’
একই এলাকার ব্যবসায়ী রেজাউল করিম তিন বছর ধরে সেখানে জ্বালানি তেল, এলপিজি ও মুদিখানার পণ্য বিক্রি করছিলেন। আগস্টের এক রাতে মালামালসহ তাঁর দোকান নদীতে তলিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘তিন বছর ধরে বাঁধের কাজ হচ্ছে। কিন্তু ভাঙন তো থামছে না। চোখের সামনে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?’
কাথুরিয়া গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী নাজমা বেগম গত ২০ বছরে ছয় দফা নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। তার প্রায় ১০ বিঘা ফসলি জমি ও একাধিক বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। এবার শেষ সম্বল ২০ শতক জমির ওপর থাকা বাড়িটিও ভাঙনের মুখে। মালামাল সরিয়ে সড়কের পাশে রেখেছেন তিনি।
নাজমা বেগম বলেন, ‘মধ্যবিত্ত কৃষি পরিবার ছিল আমাদের। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়েছি। শেষ আশ্রয়ের বাড়িটিও বিলীন হয়েছে। সন্তান ও অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না।’
ভাঙনের খবর পেয়ে পাউবোর তিন কর্মকর্তা কাথুরিয়া এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তারা জানিয়েছেন, হঠাৎ করে ভাঙন শুরু হয়েছে। বাঁধসংলগ্ন প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা কাজে আসছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, তীর রক্ষা বাঁধের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশে নদীতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছিল। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় বর্তমানে নদীতে ওই কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ব্লক তৈরির কাজ করছে।
পাউবোর শরীয়তপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ চলার মধ্যেই গত বছর কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছিল। এ কারণে ওই অংশের নকশা পরিবর্তন করা হয়। নকশা অনুমোদনের পর বর্ষার আগেই সেখানে আবার কাজ শুরু করা হয়েছিল। এর মধ্যেই নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে।’
ভাঙনকবলিত মানুষের দাবি, শুধু জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা না করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো দ্রুত স্থায়ীভাবে সুরক্ষিত করতে হবে। একই সঙ্গে গত দুই বছরে বসতভিটা হারানো পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।