✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৩, | ০৯:৫৮:০২ |২০২৫ সালে ইয়েমেনের হুথিদের লক্ষ্য করে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় ১৫৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এছাড়াও ২৪৩ জন আহত হয়েছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক পর্যালোচনায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার একজন মার্কিন কর্মকর্তা এই পর্যালোচনার তথ্য প্রকাশ করেন। এতে দেখা যায়, ২০১৫ সালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নথিবদ্ধ বেসামরিক হতাহতের সব ঘটনাই ঘটেছিল এপ্রিলে ইয়েমেনে চালানো তিনটি হামলার কারণে।বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে পেন্টাগনের বার্ষিক প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে এই অননুমোদিত (শ্রেণীবদ্ধ নয় এমন) প্রতিবেদনটি মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হয়েছিল।
এনবিসি নিউজ এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এটি হাতে পায়। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এপির সঙ্গে কথা বলেছেন। কারণ প্রতিবেদনটি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার জন্য তিনি অনুমোদিত ছিলেন না। ওই কর্মকর্তা জানান, বিভাগটি আগামী মাসগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি জমা দেবে।
এই সংখ্যাটি ২০১৪ সালের তুলনায় অনেক বেশি; ওই সময় পেন্টাগনের হিসাবে মার্কিন সামরিক অভিযানে দুজন বেসামরিক নাগরিক নিহত ও দুজন আহত হয়েছিলেন। হামলাগুলো বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানা ও এর আশপাশের এলাকায় হুথি বাহিনী এবং রাস ইসা জ্বালানি বন্দরকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল।
রাস ইসা বন্দরে চালানো হামলাটি ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী; এতে ৮০ জন নিহত ও ১৭১ জন আহত হন। ওই হামলায় আকাশে বিশাল অগ্নিকুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ে এবং বন্দরে থাকা ট্যাঙ্কার ট্রাকগুলো জ্বলতে থাকে। হুথিরা পরবর্তীতে তাদের আল-মাসিরাহ টেলিভিশন চ্যানেলে হামলার পরবর্তী পরিস্থিতির দৃশ্য প্রচার করে। যেখানে ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মৃতদেহ দেখা যায়।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানের তদারককারী সংস্থা ‘ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড’ (সেন্টকম) ওই সময় জানিয়েছিল, হুথিদের জ্বালানি ও আয়ের উৎস বিচ্ছিন্ন করাই ছিল ওই হামলার লক্ষ্য। ২০১৫ সালের এপ্রিলের ওই হামলার পর সেন্টকম বলেছিল, এই হামলার উদ্দেশ্য ইয়েমেনের জনগণের ক্ষতি করা ছিল না।
সংস্থাটি আরও জানায়, ইরান-সমর্থিত হুথি সন্ত্রাসীদের জ্বালানির উৎস ধ্বংস করতে এবং তাদের সেই অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ করতে মার্কিন বাহিনী এই পদক্ষেপ নিয়েছিল। ওই অর্থ ব্যবহার করে হুথিরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পুরো অঞ্চলে ত্রাস সৃষ্টি করে আসছে।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, বিভিন্ন ছবি ও উন্মুক্ত উৎসের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পেন্টাগনের পর্যালোচনায় শেষ পর্যন্ত এই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। ওই তিনটি হামলার ফলে বেসামরিক মানুষের ক্ষতির শিকার হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল প্রবল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বা সান্ত্বনা-সূচক অর্থ প্রদানের বিষয়টি যথাযথ ছিল না; যদিও এর কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। মার্কিন আইন অনুযায়ী এ ধরনের অর্থ প্রদান বাধ্যতামূলক নয় এবং এটি কোনো অপরাধ স্বীকারের শামিলও নয়। তবে অতীতে বেসামরিক নাগরিক নিহতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র এমন অর্থ সহায়তা প্রদান করেছে। যেমন, ২০২১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় ভুলবশত সাত শিশুসহ ১০ জন নিহত হওয়ার পর পেন্টাগন জানিয়েছিল, তারা নিহতদের স্বজনদের ক্ষতিপূরণ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইয়েমেনে মার্কিন অভিযানের ফলে হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে বেসামরিক হতাহতের খবর পাওয়ার পর সেন্টকম আরও ১৫টি ঘটনা পর্যালোচনা করছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন সামরিক অভিযানের ফলে বেসামরিক নাগরিক নিহতের বিষয়টি নতুন করে কঠোর পর্যালোচনার মুখে পড়ার মধ্যেই এই তথ্যগুলো সামনে এল।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে একটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আঘাত হানে, এতে ১৬৮ জন পর্যন্ত মানুষ নিহত হয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্যমতে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বেসামরিক মানুষের ক্ষতি কমানোর দায়িত্বে থাকা পেন্টাগনের একটি দপ্তরের আকারও কমিয়ে এনেছেন।
লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হুথি গোষ্ঠী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করার পর, ২০২৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রথমবার ইয়েমেনে হুথিদের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করে। হুথিরা জানিয়েছিল, গাজায় যুদ্ধের জেরে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং ফিলিস্তিনিদের সমর্থন জানানোর লক্ষ্যেই ওই হামলাগুলো চালানো হয়েছিল।
২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এই অভিযান আরও জোরদার হয়। ওয়াশিংটন জানায়, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে আনা এবং লোহিত সাগর দিয়ে নৌচলাচল সুরক্ষিত রাখাই ছিল এসব হামলার লক্ষ্য।
ক্যারিবিয়ান ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মাদক পাচারের অভিযোগে যেসব নৌকায় হামলা চালানো হয়েছিল, সেগুলোতে হতাহতের ঘটনা পেন্টাগনের এই মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রতিটি হামলার পর ঘোষিত মৃত্যুর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ওই সব হামলায় ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন যাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে তাদের ‘নারকো-টেররিস্ট’ বা মাদক-সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করেছে; অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই হামলাগুলোকে বেআইনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেছে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নও যাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, তাদের বিষয়ে প্রশাসনের দাবিগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করেছে।
সূত্র: আলজাজিরা।