✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১০, | ১৮:৩৭:২২ |জলবায়ু পরিবর্তনের বিষাক্ত প্রভাবে বিশ্বব্যাপী যখন আবহাওয়া চরম রূপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই গত জুলাই মাসে বিশ্বের মহাসাগরগুলো এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ উত্তাপের ভয়াবহ রেকর্ড গড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাসের তথ্যমতে, মেরু অঞ্চল বাদ দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ২০.৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
২০২৩ সালের জুলাই মাসে রেকর্ড করা ২০.৮৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আগের রেকর্ডটি ভেঙে এবার নতুন এই দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। প্রাক-শিল্পায়ন যুগের গড় তাপমাত্রার তুলনায় গত জুলাইয়ের বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা ১.৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যা পরিবেশবিদদের মনে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
মহাসাগরের এই অস্বাভাবিক উত্তপ্ত হয়ে ওঠার পেছনে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের অধিকাংশ এলাকায় বর্তমানে সমুদ্রের তাপমাত্রা অভূতপূর্ব মাত্রায় অবস্থান করছে। বিজ্ঞানীরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে, আগামী মাসগুলোতে এই এল নিনো পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী আকার ধারণ করতে পারে। প্রাকৃতিক এই আবহাওয়াগত পরিবর্তনের সাথে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রার পারদকে প্রতিদিন নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিচ্ছে।
পৃথিবীর জলবায়ু ভারসাম্য রক্ষায় মহাসাগরগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। কারণ, বাতাসে জমে থাকা অতিরিক্ত তাপের সিংহভাগ শুষে নেয় মহাসাগর এবং বায়ুমণ্ডলের অর্ধেক অক্সিজেন তৈরি করে। সমুদ্রের জলপৃষ্ঠ এভাবে আশঙ্কাজনক হারে উত্তপ্ত হতে থাকলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার বহু গুণ ত্বরান্বিত হবে। মূল কারণ হলো পানি গরম হলে তা প্রসারিত হয়, যা এখন পর্যন্ত মোট সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী। জলভাগের এই বর্ধিত উচ্চতা উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বের জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমুদ্রের এই অতিরিক্ত তাপ কেবল পানিই বাড়াচ্ছেনা, বরং মহাসাগরের ভেতরের বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক তাপদাহ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইতোমধ্যে সামুদ্রিক প্রবাল প্রাচীরগুলো বড় আকারে ধসে পড়ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বহু প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী। সমুদ্রপৃষ্ঠের অতিরিক্ত উষ্ণতা বায়ুমণ্ডলে অধিক পরিমাণে আর্দ্রতা ও তাপ বাষ্পীভূত করে পাঠায়। এর ফলে ট্রপিক্যাল বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়গুলো দিন দিন আরও বিধ্বংসী রূপ নিচ্ছে এবং সমুদ্রঘেঁষা এলাকাগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিক, মহাসাগরের এই রেকর্ড ভাঙা উত্তাপের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইউরোপের ভূখণ্ডেও। পশ্চিম ইউরোপ ইতোমধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত জুন ও জুলাই মাস প্রত্যক্ষ করেছে, যেখানে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২.৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। কোপার্নিকাসের জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুমণ্ডলের উচ্চ চাপ অঞ্চল ইউরোপের ওপর তাপ আটকে রেখেছে এবং প্রচণ্ড শুষ্ক মাটি প্রাকৃতিক শীতলীকরণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপদাহ এবং খরা কীভাবে একে অপরকে ত্বরান্বিত করছে, ইউরোপের পরিস্থিতি তারই স্পষ্ট প্রমাণ।
অতিরিক্ত শুষ্কতা ও দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহের কারণে পশ্চিম ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ সব দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। আগুনে পোড়া বনাঞ্চলের আয়তন এবং নির্গত ধোঁয়ার পরিমাণ বিবেচনায় এই বছরের অগ্নিকাণ্ডকে বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছেন। বাতাসের তোড়ে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে দাবানলের ধোঁয়া ঢুকে যাবায় তা হাজার মাইল দূরের কম ঝুঁকির দেশগুলোতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে যেসব দেশে সাধারণত দাবানল দেখা যায় না, সেসব দেশের বাতাসও এখন বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হচ্ছে।
ইউরোপের প্রধান নদীগুলোর পানিপথ এখন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে, যা মহাদেশটির সেচ, কৃষি এবং জ্বালানি খাতকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত রাইন, দানিউব ও সেন নদীর পানির স্তর এখন আশঙ্কাজনক তলানিতে ঠেকেছে। নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় পানীয় জলের সরবরাহ যেমন সংকটে পড়েছে, তেমনই থমকে গেছে নদীভিত্তিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাও। খরা ও জলের অভাব তীব্র হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশকে স্থানীয় অঞ্চলগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে খরা ঘোষণা করতে হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে জলবায়ু বিজ্ঞানীরা স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন, বিংশ শতাব্দীর যে আবহাওয়ার সাথে মানুষ অভ্যস্ত ছিল তা চিরতরে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে যেসব তাপদাহ ও চরম আবহাওয়া আমাদের কাবু করছে, তা কোনো সাময়িক ঘটনা নয় বরং এটিই এখন পৃথিবীর নতুন স্বাভাবিক অবস্থা (নিউ নরমাল)। জলবায়ুর এই চরম বিপর্যয় এবং ভূ-পৃষ্ঠের ঐতিহাসিক রূপান্তর প্রমাণ করছে, কার্বন নিঃসরণ কমানো ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিশ্ব এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনের দিনগুলোতে মানবজাতিকে আরও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হবে।
বিবিসির বিশ্লেষণ