✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১০, | ১৭:৪৮:১০ |ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান কমান্ডার মোহসেন রেজাইকে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) প্রধান নিয়োগ করা হয়েছে। দেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই কাউন্সিলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে টানাপোড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনার মধ্যেই রেজাই নতুন দায়িত্ব নিলেন। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে তেহরান।
রেজাই এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিলেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল, ইরানের সার্বভৌমত্ব ও অবরোধ নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।
তিনি মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। জোলঘাদরকে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে এই পদে ছিলেন আলী লারিজানি। মার্চে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তিনি নিহত হন।
কে এই মোহসেন রেজাই?
৭১ বছর বয়সী মোহসেন রেজাই ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার ছিলেন। তার নেতৃত্বের সময়ের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ, যাকে ইরানে ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ বা ‘স্যাক্রেড ডিফেন্স’ নামে অভিহিত করা হয়।
আইআরজিসির দীর্ঘদিনের প্রধান হিসেবে রেজাই ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সামরিক দায়িত্বের পর তিনি দেশের রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত হন।
তিনি এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইরানের পার্লামেন্ট ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে কোনও আইন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তিতে এই কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গার্ডিয়ান কাউন্সিল আলাদা একটি সাংবিধানিক সংস্থা, যার সদস্যরা সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ দেন। পার্লামেন্ট, প্রেসিডেন্ট ও অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের নির্বাচনে প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি আইনগুলো সংবিধান ও ইসলামি আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও পর্যালোচনা করে সংস্থাটি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে রেজাইয়ের কঠোর অবস্থান
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকা উচিত- এ বিষয়ে রেজাই দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছেন।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। ফলে এই জলপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
জুলাইয়ে রেজাই বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ‘ডজনখানেক পারমাণবিক বোমার’ চেয়েও বেশি মূল্যবান। গত সপ্তাহেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে ওয়াশিংটনকে ‘গুরুতর ঝুঁকি ও হতাহতের’ মুখে পড়তে হবে।
ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেহরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রও দেশটির বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ জোরদার করেছে।
কীভাবে হলো রেজাইয়ের নিয়োগ?
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের যোগাযোগ দফতর রবিবার সন্ধ্যায় রেজাইকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দেয়।
একই দিনে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি কাউন্সিলে তার প্রতিনিধি হিসেবেও রেজাইকে নিয়োগ দেন। নিয়োগ আদেশে রেজাইয়ের অভিজ্ঞতা এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা যুগের অগ্রগামীদের’ একজন হিসেবে তার ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
নিয়োগের এই ভাষ্য থেকে স্পষ্ট যে, রেজাইয়ের সামরিক অতীত তার নতুন দায়িত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে দেখা হয়েছে।
কেন এই নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ?
সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কৌশলগত অবস্থানের সমন্বয় ঘটে এই কাউন্সিলের মাধ্যমে।
তাই কাউন্সিলের প্রধান কে হচ্ছেন, সেটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; বিশেষ করে যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনিশ্চিত আলোচনা এবং হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধের সময়ে এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি।
তেহরানভিত্তিক সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক আবাস আসলানি আল-জাজিরাকে বলেন, রেজাই তার সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন দায়িত্বে আসছেন।
তার ভাষায়, ইরানের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে একই ছাতার নিচে সমন্বয় করার মতো একজন ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল।
আসলানির মতে, নিরাপত্তা ইস্যুতে রেজাই তার পূর্বসূরির তুলনায় খুব বেশি ভিন্ন নন। তবে দেশের অভ্যন্তরে ভারসাম্য রক্ষা এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় তৈরিতে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তিনি বলেন, সাবেক আইআরজিসি প্রধান এবং এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
আসলানির মতে, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাদের সঙ্গে কথা বলার সক্ষমতা রেজাইয়ের নিয়োগের অন্যতম কারণ হতে পারে।
নিয়োগের সম্ভাব্য প্রভাব কী?
রেজাইয়ের নিয়োগ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মূলত দুটি ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।
একটি ব্যাখ্যা হলো-যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনার মধ্যে ইরান তার নিরাপত্তা ও সামরিক বিবেচনাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
অন্য ব্যাখ্যাটি তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। এর মতে, সাবেক আইআরজিসি প্রধানকে দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রস্থলে আনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোনও সমঝোতা বা চুক্তিতে পৌঁছানো হলে সেটি কট্টরপন্থী মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সহজ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুটি বিপরীত বার্তা
রেজাইয়ের নিয়োগকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দুটি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
প্রথম ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপের জবাব হিসেবে তেহরান তার নিরাপত্তা ও সামরিক অবস্থান আরও কঠোর করার বার্তা দিচ্ছে। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ ও সামরিক চাপ বাড়ালে ইরানও আরও কঠোর অবস্থানের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিদের সামনে আনবে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি হলো, কঠিন কোনও সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রস্তুতি হিসেবেও রেজাইকে সামনে আনা হয়ে থাকতে পারে।
কারণ বড় কোনও সমঝোতা সবসময় মধ্যপন্থী ব্যক্তিদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এবং সামরিক-নিরাপত্তা খাতে শক্ত অবস্থান থাকা ব্যক্তিরাই এমন সমঝোতা দেশের অভ্যন্তরে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে বেশি সক্ষম হন। সূত্র: আল-জাজিরা