সর্বশেষ :
স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে দেশের প্রতিটি নাগরিককে দায়িত্ব পালনের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ডলফিনের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড চীন, সরানো হলো ১০ লাখের ‍অধিক মানুষ ইরান ইস্যুতে কার্টারের মতোই ফাঁদে পড়েছেন ট্রাম্প! আইসিসির ‘প্লেয়ার অফ দ্য মান্থ’ পুরস্কারের তালিকায় তানজিদ হরমুজ খোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা, বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম বাংলা কিউআর কোডে লেনদেন হবে ফ্রি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি : রিজভী আইসিসির সেরা ক্রিকেটারদের তালিকায় ম্যাথিউস-হারশিতা ও সিভার রদ্রিকে দলে ভেড়াতে মরিয়া বার্সেলোনা, অনিশ্চিত ডি ইয়ংয়ের ভবিষ্যৎ এশিয়ার তেলের বাজারের ‘ইরান-ধাক্কা’ একাই সামলে দিচ্ছে চীন

ব্রিকসের সামনে ইরান-পরীক্ষা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-৩১, | ১২:৫৮:০৯ |

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাত এখন আর কেবল সাময়িক সংকট নয় বরং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এক স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরেশিয়া অঞ্চলে উদ্ভূত এই নতুন অস্থিরতা আগামী বহু বছর ধরে গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।

ইরানের এই সংকট কেবল তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং ব্রিকস এবং সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবেও দেশটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। রাশিয়ার সাথে পশ্চিমা বিশ্বের সংঘাত যেমন ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়, ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বৈরিতা সরাসরি। ফলে একটি বিভক্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ব্রিকস ও এসসিওর মতো সংস্থাগুলো ঠিক কীভাবে কাজ করবে এবং কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

উভয় জোটেরই জন্ম হয়েছিল দুই হাজারের দশকের শুরুতে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থার সংকটের প্রেক্ষাপটে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং ইরাক আক্রমণ যখন বিশ্ববাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে একমেরুর বিশ্বব্যবস্থা স্থিতিশীলতা বা নিরপেক্ষ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ, তখনই ইউরেশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য ২০০১ সালে এসসিও এবং ২০০৯ সালে ব্রিকস আত্মপ্রকাশ করে।

অবশ্য কোনো জোটই সরাসরি পশ্চিমাবিরোধী বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেনি। এই সংযম দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল; প্রথমত, পশ্চিমাদের প্রতি ভিন্ন মত পোষণকারী দেশগুলোকে এক ছাতার নিচে রাখা এবং দ্বিতীয়ত, গ্লোবাল মেজরিটির যেসব দেশ একই সাথে চীন-রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায়, তাদের দূরে না ঠেলা। ফলে ব্রিকস ও এসসিও সাধারণ ঐক্যমতের নীতিতে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখে এসেছে।

তবে এই মধ্যপন্থার কৌশল এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। পশ্চিমারা যদি কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারত, তবে এমন জোট গঠনের প্রয়োজনই হতো না। তাই বিলম্বে হলেও সংস্থা দুটিকে উত্তর-পশ্চিম ব্যবস্থার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো, যা ইরান সংকট আরও ত্বরান্বিত করেছে।

এই সংঘাত জোটের ভেতরের মতপার্থক্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কেবল রাশিয়াই স্পষ্ট নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে চীন, ভারতসহ অন্যান্য সদস্যরা অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, যা সমন্বিত কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।

একই সাথে সংঘাতটি বেশ কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রথমত, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের যে দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতা ছিল, তা এখন চরম হুমকিতে। রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো নিজস্ব সম্পদ সমৃদ্ধ দেশের জন্য এটি সামাল দেওয়া সহজ হলেও চীন ও ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি গভীর উদ্বেগজনক।

দ্বিতীয়ত, পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। রাশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সাথে যুক্ত করার আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরে ইরানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত এই অঞ্চলে বিনিয়োগ ও পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলবে। এর সাথে ইসরায়েল-তুরস্ক উত্তেজনা বাড়লে মধ্য এশিয়ার অর্থনৈতিক কৌশলও পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে আঞ্চলিক মিত্র ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানেও চাপ বাড়ছে। মার্কিন বৈরিতার জেরে অঞ্চলের ধনী উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো নিজেদের ইসরায়েলের মতো পুরোপুরি সামরিকীকৃত সমাজে পরিণত করতে চায় না, ফলে তাদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।

তবে এই সংঘাত ব্রিকস ও এসসিওর জন্য একটি সুযোগও তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব এখন আর বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বা উন্নয়নের কাণ্ডারি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না, বরং অনেকেই তাদের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার উৎস হিসেবে দেখছে। ওয়াশিংটনের ইরানকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত তাদের কূটনৈতিক মনোযোগ ক্ষয় করবে এবং একাধিক সংকট একসঙ্গে সামলানোর সীমাবদ্ধতা ফাঁস করে দেবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এর সুবিধা নিতে ব্রিকসকে কোনো কঠোর উগ্র জোট হওয়ার প্রয়োজন নেই। সব দেশের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও নমনীয়তার সাথে কাজ করাই এই সংস্থাগুলোর আসল শক্তি। পশ্চিমা ব্যবস্থার কার্যকারিতা যেভাবে কমছে, তাতে ব্রিকস ও এসসিও কৃত্রিম ঐক্য তৈরির চেষ্টা না করে নিজেদের নমনীয় ও সমন্বয়বাদী কাঠামো বজায় রাখলেই তাদের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রভাব ভবিষ্যতে স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।

আরটির বিশ্লেষণ

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..