✕

সর্বশেষ :
জার্মানিতে বিপজ্জনক ছায়াযুদ্ধের শঙ্কা রাহুল গান্ধীর আবেদনে ১৪ ত্রুটি ধরল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ-ইউএই যৌথ উদ্যোগে কক্সবাজারে সুপেয় পানি প্রকল্পের প্রস্তাব দিলেন এলজিআরডি মন্ত্রী মেহেরপুরে বাসের ধাক্কায় ভ্যানচালক নিহত পাকিস্তান সিরিজে শ্রীলঙ্কার টেস্ট দল ঘোষণা, অধিনায়ক কুশল মেন্ডিস আরব আমিরাতে শ্রমবাজার ও নতুন সুযোগের সম্ভাবনা নিয়ে মাহ্দী আমিন-রাষ্ট্রদূতের বৈঠক কুমিল্লায় সকালে হাঁটতে বেরিয়ে গাড়িচাপায় স্বামী ও স্ত্রী নিহত কাদের মির্জা ও তার স্ত্রী-ছেলের বিরুদ্ধে দুদকের ৩ মামলা অবিবাহিতদের সবচেয়ে বেশি রাগিয়ে দেয় যেসব কথা দুর্গাপূজায় নৌপথে নিরাপত্তায় ১৬ নির্দেশনা

দুই তরুণ আইনজীবীর আইনি লড়াইয়ে পাকিস্তানে ‘পিরিয়ড ট্যাক্স’ প্রত্যাহার

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-১৭, | ১৩:৪৭:৩১ |

রক্ষণশীল পাকিস্তানে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য, পিরিয়ড যেন নিষিদ্ধ বিষয়। এ নিয়ে জনপরিসরে আলোচনাটাই লজ্জার বিষয়, যেন অপরাধ। বছরের পর বছর ধরে অধিকার কর্মীরা সামাজিক এই ট্যাবু ভাঙার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সামাজিক ট্যাবুর বিশাল এই অচলায়তন ভাঙা একদিনের কাজ নয়। তবে দিনের পর দিন আঘাত হানলে পাহাড়েরও ঘুম ভাঙে। দুই তরুণ আইনজীবীর আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পাকিস্তান সরকারের টনক কিছুটা হলেও নড়েছে। ‘পিরিয়ড ট্যাক্স’ নামে পরিচিত স্যিানিটারি পণ্যের ওপর আরোপিত ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান সরকার।

নারীদের পিরিয়ড একটি নিয়মিত ও স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। তবে সঠিক নিয়ম মানলে ও স্বাস্থ্যকর সানিটারি পণ্য ব্যবহার করলে পিরিয়ডকালীন সময়েও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র বা সংসারে স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন নারীরা। কিন্তু  ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের মাত্র ১২ শতাংশ নারী বাণিজ্যিক স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করেন। বাকি অধিকাংশ নারী কাপড়ের টুকরা, বা অস্বাস্থ্যকর ঘরোয়া সামগ্রী ব্যবহার করেন। যা তাদের জন্য নানান স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে এবং অনেক সময় নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে। স্যানিটারি পণ্য ব্যবহারের এই অতি নিম্নহারের মূল কারণ এর অতি উচ্চ মূল্য। এতদিন স্যানিটারি পণ্যকে রাখা হয়েছিল বিলাস পণ্যের তালিকায়।

দুই তরুণ আইনজীবীর সরকারের বিরুদ্ধে করা এক মামলার সূত্র ধরে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক পরিসরে আলোচনা শুরু হয়। গত বছরের অক্টোবরে তথাকথিত ‘পিরিয়ড ট্যাক্স’ প্রত্যাহার করতে এবং স্যানিটারি পণ্যকে বিলাস পণ্যের বদলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন ২৯ বছর বয়সী আহসান জাহাঙ্গীর খান এবং ২৫ বছর বয়সী মাহনুর ওমর নামের দুই আইনজীবী। 

মামলার আবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে স্থানীয়ভাবে তৈরি স্যানিটারি পণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর এবং আমদানি করা স্যানিটারি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ রয়েছে। ইউনিসেফের মতে, অন্যান্য স্থানীয় করের সঙ্গে যোগ হয়ে পাকিস্তানের নারীদের পিরিয়ড পণ্যের ওপর মোট ৪০ শতাংশ অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়, যা সুবিধাবঞ্চিত নারীদের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়। দুই আইনজীবীর লড়াইটা ছিল এখানেই। 

তাদের দাবি, সরকার যেন স্যানিটারি পণ্যের দাম কমিয়ে তা নারীদের জন্য সহজলভ্য করেন। তাদের অভিযোগ, এই কর আরোপের মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার নারীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকারকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবহেলা করেছে, যা জনজীবনে তাদের পূর্ণ অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। এটি পাকিস্তানের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন, যা লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে।

দুই আইনজীবীর মামলার পর পাকিস্তান সরকারের কাছে এর জবাব চায় দেশটির আদালত। তবে আদালতের কাছে দেওয়া জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্যানিটারি পণ্যের ওপর কর হার অতিরিক্ত বা বৈষম্যমূলক নয়। ‍কারণ এই কর কাঠামো রাষ্ট্রের রাজস্ব চাহিদা মেটানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা দিয়ে নারীদের সুবিধাসহ বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজে অর্থায়ন করা হয়।

বছরের শুরুতে আদালতের কাছে দেওয়া জবাবে স্যানিটারি পণ্যের ওপর আরোপিত করকে অতিরিক্ত ও বৈষম্যমূলক মনে না করলেও দৃশ্যত সরকারের অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে। গত সপ্তাহে দেশের জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনায় স্যানিটারি পণ্যের ওপর থেকে ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। গত শুক্রবার পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বলেন, এই ধরনের পণ্যগুলো নারীদের স্বাস্থ্য, মর্যাদা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে পূর্ণ অংশগ্রহণের জন্য অপরিহার্য।

বিক্রয় কর প্রত্যাহারের এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও, স্যানিটারি প্যাড তৈরির কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত শুল্কসহ স্যানিটারি পণ্যের ওপর থাকা কর ব্যবস্থাটি পুরোপুরি বিলোপের দাবি জানিয়েছেন মামলার আবেদনকারী দুই আইনজীবী। জাহাঙ্গীর খান বলেন, এই মামলাটি স্যানিটারি পণ্যের ওপর থাকা কর ব্যবস্থার অযৌক্তিকতাকে সবার সামনে তুলে ধরেছে। যদি এই সাংবিধানিক পিটিশনটি না করা হতো, তবে সরকার হয়তো কখনোই অনুধাবন করতে পারতো না যে বিক্রয় কর নেওয়াটাও ভুল ছিল।

অধিকারকর্মীরা বলছেন, ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর প্রত্যাহার করলেও তা হয়তো সাধারণ নারীদের নাগালে আসবে না। পাকিস্তানের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ বৈশ্বিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন, যাদের দৈনিক আয় ১ হাজার ১৭৫ পাকিস্তানি রুপি। এক প্যাকেট স্যানিটারি প্যাড কিনতে একদিনের আয়ের তিনভাগের এক ভাগ খরচ হয়ে যাবে। 

তারপরও দুই আইনজীবীর মামলা, সরকারের বোধোদয়ের সূত্রে নারীদের পিরিয়ড ও পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে জনপরিসরে যে আলোচনা হচ্ছে, তার ‍গুরুত্ব অনেক। পিরিয়ড নিয়ে সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে, কুসংস্কার দূর করতে এবং এই লড়াইকে এগিয়ে নিতে এই আলোচনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

সরকার স্যানিটারি পণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর প্রত্যাহার করলেও মামলাটি নিষ্পক্তি হয়নি। সরকারের জবাবের পর মামলাটি এখন চূড়ান্ত যুক্তিতর্কের জন্য প্রস্তুত। ওমর ও খানের মামলাটি সফল হলে, পাকিস্তানের আদালত স্যানিটারি পণ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত কর, কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্কসহ— অথবা আমদানি করা স্যানিটারি পণ্যের ওপর থেকে সমস্ত কর প্রত্যাহারের নির্দেশ দিতে পারে। আবেদনকারী দুই আইনজীবী বলছেন, চূড়ান্ত বিজয় না আসা পর্যন্ত তারা লড়াই চালিয়ে যাবেন।

তথ্যসূত্র : সিএনএন

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..