একজন মুমিনের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হলেন মহানবী (সা.)। তাঁর জীবন শুধু ইবাদতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং খাদ্যাভ্যাস, চলাফেরা, আচরণ—সবকিছুতে আছে পরিমিতি, ভারসাম্য ও প্রজ্ঞার অপূর্ব সমন্বয়। তিনি কী খেতেন, কিভাবে খেতেন এবং কোন খাবারগুলো পছন্দ করতেন—এসব বিষয় জানার মধ্যে আছে সুন্নাহকে জীবন্ত করে তোলার এক সুন্দর প্রচেষ্টা। আর মহানবী (সা.)-এর খাদ্যতালিকা ছিল সরল, পুষ্টিকর ও সহজলভ্য উপাদানে ভরপুর, যা আমাদের জন্য একটি পরিপূর্ণ ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারার দিকনির্দেশনা বহন করে। ইবনুল কাইয়্যুম (রহ.) বলেন, খাবারের ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর নীতি ছিল এমন—যা সহজলভ্য হতো তিনি তা কখনো প্রত্যাখ্যান করতেন না। আর যা সহজে পাওয়া যেত না, তা কখনো খোঁজাখুঁজি করতেন না। তাঁর সামনে যে উত্তম খাবারই পরিবেশন করা হতো, তিনি তা গ্রহণ করতেন। তবে যদি তিনি কোনো খাবার পছন্দ না করতেন, তাহলে কোনো কিছু না বলেই তিনি রেখে দিতেন। তিনি কখনো খাবারের সমালোচনা করতেন না; ইচ্ছা হলে খেতেন, আর ইচ্ছা না হলে শান্তভাবে রেখে দিতেন। তিনি পরিমিত খাবার গ্রহন করতেন। (জাদুল মাআদ, পৃষ্ঠা : ৪৬)
মহানবী (সা.)-এর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে বেশ কিছু সহিহ হাদিসে স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব বর্ণনা থেকে তাঁর খাদ্যরুচি, সরলতা ও পরিমিত জীবনধারার এক অনন্য চিত্র ফুটে ওঠে। যেমন— ১. মধু : আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) মিষ্টি ও মধু খুব পছন্দ করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৪৩১) এ থেকে বোঝা যায়, প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর খাদ্যের প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল।
২. খেজুর : সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন তার ওপর কোনো বিষ বা জাদুর প্রভাব পড়বে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২০৪৭) আরেক বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমরা দুটি কালো বস্তু—খেজুর ও পানি দিয়ে জীবনধারণ করতাম। তবে আনসারদের কিছু প্রতিবেশী আমাদের মাঝে দুধ পাঠাতেন, আর রাসুল (সা.) তা আমাদের পান করতে দিতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৬৭)
৪. জলপাই তেল : আবু উসাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জলপাই তেল খাও এবং তা শরীরে মালিশ করো, কারণ এটি একটি বরকতময় গাছ থেকে উত্পন্ন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৮৪০) এ হাদিসে জলপাই তেলের খাদ্যগুণের পাশাপাশি এর বাহ্যিক ব্যবহারেও উপকারিতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
৫. জবের রুটি : আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর পরিবার টানা দুই দিনও পেট ভরে জবের রুটি খেতে পারেননি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৭০) এই বর্ণনা মহানবী (সা.)-এর দুনিয়াবিমুখতা, ধৈর্য ও অল্পে তুষ্ট থাকার বিষয়টি তুলে ধরে।
৬. দুধ : দুধ ছিল মহানবী (সা.)-এর অত্যন্ত পছন্দনীয় খাবারের একটি। তাই ইসরা ও মিরাজের রাতে তিনি দুধকেই বেছে নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করে পান করলাম। তখন আমাকে বলা হলো, ‘আপনি এবং আপনার উম্মত স্বভাবজাত সঠিক পথ (ফিতরাহ) বেছে নিয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪৩৭)
৭. পনির : আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা বলেন, ‘তাবুকের যুদ্ধে মহানবী (সা.)-এর সামনে পনির আনা হয়। তিনি একটি ছুরি আনতে বললেন, ‘বিসমিল্লাহ’ বলে তা কাটলেন খেলেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮১৯)
৮. মাংস : আল্লাহর রাসুল (সা.) মাংস পছন্দ করতেন, বিশেষত ভেড়ার সামনের পা (কাঁধ ও আগার অংশ) তাঁর কাছে বেশি প্রিয় ছিল। এ কারণেই একবার তাঁকে বিষপ্রয়োগের ঘটনায় এই অংশটিই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। দুবাআ বিনতে জুবায়ের (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একবার নিজের ঘরে একটি ভেড়া জবাই করেন। নবী (সা.) তাঁর কাছে কিছু মাংস পাঠাতে বললে তিনি জবাব দেন, আমাদের কাছে ঘাড় ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই, আর আমি তা পাঠাতে সংকোচ বোধ করছি। তখন নবী (সা.) বলেন, ‘তুমি সেটিই পাঠাও; কারণ এটি ভেড়ার উত্তম অংশ, কল্যাণের নিকটবর্তী এবং অনিষ্ট থেকে অধিক দূরে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৫৭৯)
৯. সারিদ : মহানবী (সা.)-এর প্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে ‘সারিদ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘মহানবী (সা.) রুটি দিয়ে তৈরি সারিদ এবং খেজুর ও ঘি দিয়ে প্রস্তুত সারিদ খুব পছন্দ করতেন।’(আবু দাউদ, হাদিস : ৩৭৮৩) সারিদ মূলত একটি সুপরিচিত আরবি খাবার, যা রান্না করা মাংসের ঝোলের সঙ্গে টুকরো করা রুটি মিশিয়ে তৈরি করা হয়। এটি ছিল পুষ্টিকর, সহজপাচ্য এবং তত্কালীন সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাদ্য।
১০. খরগোশ : আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘আমরা ‘মাররা আল জাহরানে’ একটি খরগোশ তাড়া করেছিলাম। সাহাবিরাও সেটির পিছু ধাওয়া করেন। আমি সেটি ধরে আবু তালহা (রা.)-এর কাছে নিয়ে যাই। তিনি সেটি জবাই করে তার পেছনের অংশ ও উরু আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে পাঠান। তিনি তা গ্রহণ করেন।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তিনি কি তা খেয়েছেন?’ তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, তিনি তা খেয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৪৩৩)
১১. মুরগি : জাহদাম জারমি (রা.) বর্ণনা করেন, আমরা আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি আমাদের জন্য খাবারের আয়োজন করলেন, যাতে মুরগির মাংস ছিল। এক ব্যক্তি দ্বিধাগ্রস্ত হলে তিনি বলেন, ‘এসো! আমি নিজে আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে এ থেকে খেতে দেখেছি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৪৯)
১২. লাউ : আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, একজন দর্জি নবী (সা.)-কে দাওয়াত দিলেন। আমি তাঁর সঙ্গে গেলাম। সেখানে জবের রুটি ও লাউ-মিশ্রিত মাংসের ঝোল পরিবেশন করা হয়। আমি লক্ষ্য করলাম, মহানবী (সা.) বাটির চারপাশ থেকে লাউ খুঁজে খুঁজে খাচ্ছেন। সেই দিন থেকে আমিও লাউ খাওয়া পছন্দ করতে শুরু করি।’(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৪৩৬)
মহানবী (সা.)-এর খাদ্যাভ্যাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাই—এতে কোনো বিলাসিতা ছিল না; বরং ছিল সংযম, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহভীতি। তিনি যা পেতেন, তা-ই সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করতেন এবং অপচয় থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতেন।
প্রিয় নবীর এই অনন্য জীবনধারা আমাদের শেখায়—সুস্থ ও বরকতময় জীবনের জন্য প্রয়োজন সরলতা, পরিমিতি ও সুষম খাদ্যাভ্যাস।