✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-২৬, | ১৩:১০:৩৩ |ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর পদ্ধতি। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এটি রোগ নিয়ন্ত্রণে, অনেক ক্ষেত্রে রোগ সারাতে, আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যথা, রক্তক্ষরণ বা শ্বাসকষ্ট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো রেডিওথেরাপি নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক ভয়, ভুল ধারণা ও কুসংস্কার আছে। ফলে অনেকে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা নিতে দেরি করেন বা অযথা আতঙ্কে ভোগেন।
বাস্তবে রেডিওথেরাপির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, তবে সেগুলোর বেশিরভাগই সাময়িক, নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে সহনীয় পর্যায় থাকে ।
রেডিওথেরাপি নিয়ে সাধারণ ভয়:
বাংলাদেশে রোগীরা সাধারণত কয়েকটি বিষয় নিয়ে বেশি ভয় পান। যেমন:
১. শরীর পুড়ে যাবে
২. সব চুল পড়ে যাবে
৩. শরীর একেবারে দুর্বল হয়ে যাবে
৪. চিকিৎসা নিতে নিতে মানুষ শেষ হয়ে যায়
৫. রেডিওথেরাপি মানেই খুব কষ্টকর চিকিৎসা
এই ভয়গুলো কিছু কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো অতিরঞ্জিত বা ভুলভাবে ছড়ানো ধারণা। আধুনিক রেডিওথেরাপি আগের তুলনায় অনেক বেশি নিখুঁত ও নিরাপদ।
রেডিওথেরাপির সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া:
সব রোগীর একই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না। এটি নির্ভর করে শরীরের কোন অংশে রেডিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে তার উপর। তবে কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো:
১. ক্লান্তি: এটি সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা। অনেক রোগী চিকিৎসার মাঝামাঝি বা শেষে দুর্বলতা, অলসতা বা বেশি বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করেন।
২. ত্বকের পরিবর্তন: যে জায়গায় রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়, সেখানে লালচে ভাব, কালচে হওয়া, শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া বা চুলকানি হতে পারে। অনেকটা রোদে পোড়া ত্বকের মতো লাগতে পারে।
৩. খাওয়ায় সমস্যা: মাথা-ঘাড় অঞ্চলে রেডিওথেরাপি হলে গিলতে কষ্ট, মুখে ঘা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, স্বাদের পরিবর্তন হতে পারে।
৪. বমিভাব বা পাতলা পায়খানা: পেট বা তলপেটের অংশে রেডিওথেরাপি হলে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৫. চুল পড়া: মাথায় রেডিওথেরাপি দিলে শুধুমাত্র চিকিৎসা দেওয়া অংশের চুল পড়তে পারে। সারা শরীরের চুল সাধারণত পড়ে না।
বেশিরভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই চিকিৎসা চলাকালীন বা কিছুদিন পরে দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে কমে যায়। সবাই খুব কষ্ট পান, এমন নয়। কারও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম হয়, কারও কিছুটা বেশি হয়। এটি নির্ভর করে:
ক. রেডিওথেরাপির জায়গা
খ. মোট ডোজ
গ. রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থা
ঘ. একই সঙ্গে কেমোথেরাপি চলছে কি না
ঙ. পুষ্টি ও অন্যান্য রোগের অবস্থা
সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার:
১. রেডিওথেরাপি পাচ্ছে এমন রোগীদের সাথে থাকা বা খাওয়া দাওয়া করা যায় না
২. রেডিয়েশন থেরাপি দিলে পুরো শরীর রেডিয়েশন হয়ে যায়
৩. চিকিৎসার সময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে বুঝতে হবে চিকিৎসা ভুল হচ্ছে
৪. একবার রেডিওথেরাপি শুরু করলে আর বাঁচার আশা থাকে না
এ কথার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তারপরও বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে এ ধরনের ভয় আরও বেশি কয়েকটি কারণে:
প্রথমত, রোগীরা চিকিৎসা শুরু করার আগেই অন্যের মুখে নানা ভয়াবহ গল্প শুনে আসেন।
দ্বিতীয়ত, অনেক সময় রোগী ও পরিবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং হয় না।
তৃতীয়ত, অনেক রোগী দেরিতে ধরা পড়েন, ফলে রোগ জটিল অবস্থায় থাকে।
চতুর্থত, পুষ্টিহীনতা, রক্তশূন্যতা, ডায়াবেটিস, ধূমপান, দীর্ঘ যাতায়াত ও আর্থিক চাপ চিকিৎসা সহ্য করাকে কঠিন করে তোলে।
কীভাবে এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো সামলানো যায়?
রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মানেই আতংক নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিছু নিয়ম মেনে চললে অনেক উপকার পাওয়া যায়।
১. চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত খেতে হবে
২. পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে
৩. পুষ্টিকর ও নরম খাবার খেতে হবে
৪. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে
৫. ধূমপান ও তামাক বন্ধ করতে হবে
৬. চিকিৎসা দেওয়া জায়গায় ঘষাঘষি বা গরম সেঁক দেওয়া যাবে না
৭. নিজের ইচ্ছামতো কোনো ক্রিম, তেল বা হারবাল কিছু ব্যবহার করা ঠিক নয়
৮. মুখে রেডিওথেরাপি হলে মুখ ও দাঁতের যত্ন খুব জরুরি
কখন দ্রুত চিকিৎসককে জানাতে হবে?
১. খুব বেশি জ্বর
২. শ্বাসকষ্ট
৩. গিলতে না পারা
৪. বারবার বমি
৫. তীব্র ডায়রিয়া
৬. অসহনীয় ব্যথা
৭. ত্বকে গুরুতর ক্ষত
৮. রক্তপাত
শেষকথা:
রেডিওথেরাপি নিয়ে ভয় পাওয়ার চেয়ে সঠিক তথ্য জানা বেশি জরুরি। এটি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই সাময়িক এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তাই কুসংস্কার, গুজব বা ভয় নয়, চিকিৎসকের পরামর্শের উপর আস্থা রাখা উচিত।