বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপ বা সেমিকন্ডাক্টরের তীব্র সংকট আগামী বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় সরবরাহকারীরা চাহিদার তুলনায় কেবল ৬০ শতাংশ চিপ উৎপাদন করতে সক্ষম হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার প্রভাবে বিদ্যুৎ ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে নিক্কেই এশিয়া।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের দ্রুত প্রসারের ফলে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সাধারণ স্মার্টফোন বা ব্যক্তিগত কম্পিউটারের মেমোরি চিপের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ংটেকে চতুর্থ কারখানা চালুর পরিকল্পনা ছিল বিশ্বের শীর্ষ মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্যামসাংয়ের। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ২০২৭ সালের আগে সেখানে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এমনকি বর্তমানে নির্মাণাধীন পঞ্চম কারখানাটিও ২০২৮ সালের আগে সচল করা সম্ভব না।
স্যামসাংয়ের মেমোরি ব্যবসার প্রধান কিম জে-জুন জানান, ২০২৬ ও ২০২৭ সালে চিপ সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। অন্যদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেমোরি নির্মাতা এসকে হাইনিক্স গত ফেব্রুয়ারিতে একটি নতুন এইচবিএম কারখানা চালু করেছে। কারখানাটি ২০২৬ সালে চিপের বাজারে সামান্য স্বস্তি দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালের মধ্যে সিউলের কাছে আরেকটি প্ল্যান্ট তৈরির কাজ ত্বরান্বিত করছে।
এসকে গ্রুপের চেয়ারম্যান চে তাই-ওন জানান, কাঁচামালের ঘাটতি ও উৎপাদনের সীমাবদ্ধতার কারণে এআই মেমোরি চিপের সংকট ২০৩০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিষ্ঠান মাইক্রোন টেকনোলজিও উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৭ সালে সিঙ্গাপুরে এইচবিএম উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কোম্পানিটি।
মূলত স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রোন মিলে বিশ্বব্যাপী মেমোরি চিপ বাজারের ৯০ শতাংশ হিস্যা দখলে রেখেছে। কয়েক বছর ধরে তিন কোম্পানি এআই খাতের জন্য বিশেষায়িত এইচবিএম চিপ তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় স্মার্টফোন ও পিসির সাধারণ মেমোরি চিপের উৎপাদন পিছিয়ে গেছে। ফলে ২০২৫ সালের শেষ দিকে বাজারে সাধারণ মেমোরির ঘাটতি দেখা দেয় এবং ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) মেমোরির দাম প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়ে যায়।
হংকং-ভিত্তিক কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের মতে, এ সংকট কাটাতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর অন্তত ১২ শতাংশ হারে উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে কোম্পানিগুলোর পরিকল্পনা মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এদিকে গত মাসে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নেক্সপেরিয়া ও এর চীনা শাখার মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ায় বিশ্ববাজারে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ সরবরাহে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে চীন।
পাশাপাশি বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের তীব্র সংকটে স্মার্টফোনের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি এআই প্রযুক্তির প্রসারের ফলে মেমোরি চিপের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেছে। মেটা, গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা সেন্টারের জন্য বিপুল পরিমাণ চিপ কিনছে। চিপ নির্মাতারাও এখন বেশি মুনাফার আশায় স্মার্টফোনের চেয়ে ডেটা সেন্টারের চিপ তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে স্মার্টফোনের জন্য প্রয়োজনীয় ডি-র্যাম চিপের সংকট দেখা দিয়েছে এবং এর দামও আকাশচুম্বী হয়ে গেছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্মার্টফোন কিংবা ডিভাইসের দামে।
পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ায় সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরির প্রধান কাঁচামাল ওয়েফারের সংকটও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে জানিয়েছে এসকে গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান চে তাই-উন মনে করেন, চলমান এ সংকট আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এআইয়ের বিস্তারের কারণে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মেমোরি চিপের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এসব চিপের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ওয়েফার উৎপাদন বাড়াতে অন্তত চার-পাঁচ বছর সময় প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি ঘাটতি তৈরি হতে পারে।’
এ জাতীয় আরো খবর..