ফুটবল বিশ্বকাপের নতুন মুখ: চার দেশের স্বপ্নের অভিযাত্রা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-১৩, | ১৭:৪৬:২০ |
মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার মানুষের দেশ কুরাসাও। পুরো দেশের জনসংখ্যা ঢাকার একটি থানার চেয়েও কম! অথচ এবার বিশ্বকাপ খেলছে তারা।

ফুটবলের ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন। এত কম জনসংখ্যার কোনো দেশ আগে কখনো বিশ্বকাপে খেলেনি। কিন্তু কুরাসাও একা নয়। এবার আরো তিনটি দেশ প্রথমবার পা রাখছে ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে। এগুলো হলো কেপ ভার্দে, জর্ডান আর উজবেকিস্তান।

ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখে সবাই, কিন্তু বেশির ভাগের কাছে সেটা স্বপ্নই থেকে যায়। দল সংখ্যা ৩২ থেকে ৪৮ হওয়ায় এবার সুযোগও একটু বেশি। কিন্তু সুযোগ আর যোগ্যতা এক জিনিস নয়। মার্চের প্লে-অফ পর্যন্ত নয়টি দেশ স্বপ্নের দোরগোড়ায় পৌঁছেছিল, সেখানে টিকিট পেয়েছে মাত্র চারটি। এ চার নতুন মুখের প্রতিটির গল্পই আলাদা, তবে শুরুটা করা যাক আফ্রিকার এক ছোট দ্বীপদেশ দিয়ে।

কেপ ভার্দে: আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে বহু দূরে আটলান্টিক মহাসাগরে ১০টি আগ্নেয় দ্বীপ নিয়ে গড়া ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে। মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের এ দেশ জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বকাপ ইতিহাসের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম অংশগ্রহণকারী। আইসল্যান্ড (২০১৮) ও কুরাসাওয়ের পরেই তাদের অবস্থান।

‘ব্লু শার্কস’ নামে পরিচিত দলটি ২০১৩ ও ২০২৩ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গেছে। তাই বড় মঞ্চের অভিজ্ঞতা একেবারে শূন্য নয়। আফ্রিকার বাছাইপর্বে ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলে গ্রুপ শীর্ষে থেকে উত্তীর্ণ হয়েছে তারা। বিশ্বকাপে গ্রুপ এইচে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরব।

কুরাসাও: ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসের অধীন স্বায়ত্তশাসিত ক্যারিবিয়ান দ্বীপ কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার। ইতিহাসের পাতায় এ দেশটি এখন বিশ্বকাপে অংশ নেয়া সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ। কুরাসাওয়ের খেলোয়াড়দের বেশির ভাগ জন্মেছেন নেদারল্যান্ডসে। বাছাইপর্বে দলটিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কিংবদন্তি ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। তবে পারিবারিক কারণে তাকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। দ্বীপটির সংস্কৃতিতে ডাচ, স্প্যানিশ, পর্তুগিজসহ পাঁচ-ছয়টি ভাষার মিশেল—বৈচিত্র্যই এখানকার পরিচয়। গ্রুপ-ইতে জার্মানি, একুয়েডর ও আইভরিকোস্টের মুখোমুখি হবে কুরাসাও। ফলাফল যা-ই হোক, দ্বীপজুড়ে উৎসব যে থামবে না সেটা অনুমিতই।

জর্ডান: পাঁচটি দেশের সীমানাঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা জর্ডান পর্যটনের মানচিত্রে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। পেত্রার গোলাপি পাথর, মৃত সাগরের অতল নিম্নতা কিংবা ‘ডিউন’-এর চিত্রায়ণে ব্যবহৃত ওয়াদি রামের মরু প্রান্তর—পর্যটকদের টানে নিরন্তর। কিন্তু এবার ফুটবলে জর্ডান জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব। গত বছর জুনে ওমানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে এশিয়ার গ্রুপ-বিতে দক্ষিণ কোরিয়ার পরেই দ্বিতীয় হয়ে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করে দেশটি। ২০২৩ এশিয়ান কাপের ফাইনালিস্ট হওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের এ যাত্রায় বিশ্বাস জুগিয়েছে। বিশ্বকাপে গ্রুপ জে-এর অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া ও আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়তে হবে জর্ডানকে। তবে দলে আছে লক্ষণীয় কিছু নাম। স্তাদ রেনেতে খেলা মুসা আল-তামারি শীর্ষ পাঁচ লিগে গোল করা প্রথম জর্ডানীয়। কেন্দ্রীয় রক্ষণে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান ইয়াজান আল-আরাব, যিনি ‘কে’ লিগের ২০২৫ সালের বর্ষসেরা একাদশেও জায়গা পেয়েছেন।

উজবেকিস্তান: সিল্ক রোডের কেন্দ্রে অবস্থিত উজবেকিস্তান। যে দেশ থেকে যেকোনো দিকে সমুদ্রে পৌঁছাতে দুটি দেশ পার হতে হয়। এ বিরল ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের দেশটি এবার ইতিহাস গড়েছে অন্যভাবে। মধ্য এশিয়া থেকে প্রথম কোনো দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে তারা। কিন্তু এই পথ মসৃণ ছিল না। ২০১৪ সালে জর্ডানের বিরুদ্ধে ৯-৮ পেনাল্টি শুটআউটে বিদায়, ২০০৬ সালে বাহরাইনের বিপক্ষে বিতর্কিত অ্যাওয়ে গোলে বাদ পড়া— ব্যর্থতার এক দীর্ঘ ইতিহাস বয়ে বেড়াচ্ছিল ‘হোয়াইট উলভস’। এবার বাছাইপর্বে অপরাজিত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে কোয়ালিফাই করে তারা। দলের কোচ হিসেবে আছেন ২০০৬ বিশ্বকাপজয়ী ইতালির অধিনায়ক ও ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ফাবিও ক্যানাভারো। ম্যানচেস্টার সিটির আবদুকোদির খুসানভ দলের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তবে চোখ রাখতে হবে ওস্তন উরুনভ ও আব্বোস ফাইজুল্লায়েভের দিকে। ২০২৩ সালের এএফসি ইয়ুথ প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার খেতাবজয়ী ফাইজুল্লায়েভ বিশ্বকাপের মঞ্চে চমক দেখাতে মরিয়া।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ছয়টি নতুন দলের একসঙ্গে অভিষেক ঘটে ২০০৬ আসরে। এবার সেই সংখ্যা চার। ১১ জুন যখন বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে, এ চার দলের সমর্থকরা হয়তো সবচেয়ে বড় উদযাপনটাই করবেন। জিতলে উৎসব, হারলেও উৎসব। তাদের কাছে এ বিশ্বকাপে মাঠে থাকাটাই বড় জয়।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..