সর্বশেষ :

পূর্ণিমা কি সত্যিই মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-০৮, | ১৯:২৮:৪৭ |
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস গড়ে উঠেছে—পূর্ণিমার চাঁদ তাদের আচরণ, মেজাজ এমনকি মানসিক অবস্থাকেও প্রভাবিত করে। এ ধারণার জন্ম প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল ও রোমান ইতিহাসবিদ প্লিনি দ্য এল্ডারের সময়কালে। তারা মনে করতেন, চাঁদ মানুষের মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করতে পারে। এমনকি ইংরেজি শব্দ ‘লুনাটিক’ এসেছে ল্যাটিন শব্দ লুনাটিক্যাস থেকে, যার অর্থ ‘চাঁদের প্রভাবে উন্মাদ’ বা ‘মুনস্ট্রাক’।

তবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ চাঁদকে নানা রহস্যময় ঘটনার জন্য দায়ী করলেও আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে—এ সম্পর্ক আসলে কাকতালীয়। প্রাচীন ধারণা অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্ক আর্দ্র বা জলীয় হওয়ায় চাঁদের প্রভাব সমুদ্রের মতোই মানুষের ওপর পড়তে পারে। পরবর্তীতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড লিবারসহ কিছু গবেষক ধারণা দেন, যেহেতু মানবদেহের বড় অংশ পানি, তাই জোয়ার-ভাটার মতো মানুষও চাঁদের প্রভাব অনুভব করতে পারে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা দ্রুতই এ তত্ত্বকে খারিজ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাব পৃথিবীর তুলনায় এতই কম যে এটি মানুষের শরীরে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পদার্থবিদ ও মনোবিজ্ঞানীরা প্রায় একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন— পূর্ণিমার সঙ্গে মানুষের আচরণের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। ১৯৮৫ সালে ৩৭টি গবেষণার একটি বিশ্লেষণেও পূর্ণিমা ও অপরাধ, আত্মহত্যা বা মানসিক সমস্যার মধ্যে কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

যখন কোনো বিশ্বাস হাজার বছরের পুরোনো হয়, তখন মানুষ ধরে নেয় এর পেছনে নিশ্চয়ই কিছু সত্য আছে। ডিসকভার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রাচীনকালে উজ্জ্বল পূর্ণিমার আলোর কারণে মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটত। ঘুমের ঘাটতিতে মানুষের মেজাজ ও আচরণগত পরিবর্তনের জন্য তখন থেকে চাঁদকে দায়ী করা হত। আধুনিক গবেষণায়ও চাঁদের প্রভাবে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চাঁদের প্রভাব নিয়ে মানুষের বিশ্বাস মূলত ‘কনফরমেশন বায়াস’—অর্থাৎ আমরা যেটা বিশ্বাস করি, সেটার পক্ষে প্রমাণ খুঁজি এবং বিপরীত উদাহরণগুলো উপেক্ষা করি। পূর্ণিমার রাতে ঘটা অদ্ভুত ঘটনা আমাদের বেশি মনে থাকে। ফলে মনে হয়, চাঁদের কারণেই এমন হচ্ছে।

বিজ্ঞান চাঁদ ঘিরে অনেক মিথ ভেঙে দিলেও লোককথা, কুসংস্কার ও সংস্কৃতির প্রভাব এখনো মানুষের বিশ্বাসে রয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন আদিবাসী সংস্কৃতিতে চাঁদ সময় গণনা, প্রকৃতির ছন্দ বোঝা ও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই প্রতিটি পূর্ণিমার আলাদা নামও রয়েছে।

জ্যোতিষশাস্ত্রে চাঁদকে মানুষের আবেগ, অন্তর্দৃষ্টি ও অবচেতন মনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। চাঁদের একটি পূর্ণ চক্র সম্পন্ন হতে প্রায় ২৯ দশমিক ৫ দিন সময় লাগে। এ চক্রের প্রতিটি ধাপকে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে আলাদা অর্থ দেয়া হয়। পূর্ণিমাকে আত্মবিশ্লেষণের সময় হিসেবে দেখা হয়, আর অমাবস্যাকে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের সময় বলে ধরা হয়।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..