✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৮, | ০৬:৫৪:১৯ |হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে নিজের চাকরি বাঁচাতে গত শুক্রবারে সংবাদমাধ্যমে গিয়েছিলেন কেটি জ্যাকারিয়া। কিন্তু সেখানেই এক চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন তিনি। ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক লরেন্স জোন্স তাকে সোজা প্রশ্ন করেন, বারবার নিজেকে আইনজীবী হিসেবে দাবি করলেও তিনি যে কখনোই বার পরীক্ষায় পাস করেননি, সেই তথ্য গোপন রাখা নিয়ে কি তার কোনো আক্ষেপ আছে? জ্যাকারিয়ার উত্তর ছিল মাত্র কয়েকটি শব্দের, ‘আমাকে তো এই প্রশ্নগুলো করা হয়নি।’
আর মূল সমস্যাটি এখানেই তৈরি হয়েছে। বিষয়টা শুধু তার যোগ্যতার অভাব নয়, বরং ব্যাকগ্রাউন্ড ও তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের মতো একটি মৌলিক বিষয়ে ট্রাম্প এবং তার হোয়াইট হাউসের ব্যর্থতা এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে জ্যাকারিয়ার অবিশ্বাস্য রকমের সংক্ষিপ্ত ও অশান্ত এই সময়কাল হয়তো ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় ভুল নয়, তবে এটি চরম অস্বস্তি ও লজ্জার দৌড়ে অনেক ওপরের দিকেই থাকবে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ঘটায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে হোয়াইট হাউসের এই কাণ্ড পুরো প্রশাসনকে লক্ষ্যহীন, হঠকারী এবং অহংকারী হিসেবে ভোটারদের সামনে তুলে ধরেছে।
শুক্রবার ট্রাম্প নিজে জ্যাকারিয়াকে পদচ্যুত করেন। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তার এই বিদায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে কোনো শীর্ষ উপদেষ্টার সবচেয়ে দ্রুত বিদায়ের নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মাত্র ১১ দিন টিকতে পারা যোগাযোগের পরিচালক অ্যান্থনি স্কারামুচির সংক্ষিপ্ত সময়ের রেকর্ড অর্ধেক হয়ে গেছে। ট্রাম্প সাধারণত কেটি জ্যাকারিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেছিলেন এবং নিজের ভুল স্বীকার করতে তিনি বরাবরই নারাজ, তাই তাকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিতে পুরো সপ্তাহজুড়ে এক মারাত্মক পরিস্থিতি পার করতে হয়েছে।
গত মঙ্গলবারে জ্যাকারিয়া তার উদ্বোধনী ব্রিফিংয়ে মাত্র ১৪ মিনিটের মতো উপস্থিত ছিলেন। সেখানে লিখিত বক্তব্যের ওপর ভর করে তাকে নার্ভাসভাবে বারবার তোতলাতে দেখা যায়। ব্রিফিং শেষে তিনি কেবল রক্ষণশীল ঘরানার তিনটি গণমাধ্যমের প্রতিনিধির প্রশ্নের উত্তর দেন। এরপর নিজের অবস্থান শক্ত করতে তিনি একাধিক সংবাদমাধ্যমে উপস্থিত হলেও তার বক্তব্য হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র হিসেবে তার অযোগ্যতাকেই আরও স্পষ্ট করে তোলে। পরিস্থিতি বুঝে ট্রাম্প তাকে দ্বিতীয় কোনো ব্রিফিংয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দিয়েই বরখাস্ত করেন।
এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু বিষয় হোয়াইট হাউসকে ভীষণ লজ্জায় ফেলেছে। সাবেক প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট গত ১২ আগস্ট পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ফলে উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে নেওয়ার জন্য দুই মাসেরও বেশি সময় পাওয়া গিয়েছিল, কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথমে হোয়াইট হাউসের একাধিক প্রার্থীর একটি তালিকা থাকলেও তাদের কেউ কেউ অতীতে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন বলে বাদ পড়েন। এরপর হঠাৎ করে তালিকার বাইরে থেকে শেষ মুহূর্তে জ্যাকারিয়ার নাম ভেসে ওঠে এবং ট্রাম্পের পছন্দের ওপর ভর করে উপদেষ্টারা রাতারাতি তা বাস্তবায়ন করেন।
ট্রাম্প অবশ্য তাকে বেছে নেওয়ার পেছনে কিছু স্পষ্ট কারণ ছিল। ক্যাবল টিভিতে নিয়মিত ট্রাম্পের পক্ষে জ্যাকারিয়ার জোরালো বক্তব্য দেখে ট্রাম্প মুগ্ধ হয়েছিলেন, যা ট্রাম্পের কর্মী বাছাইয়ের একটি অন্যতম প্রিয় মাধ্যম। কিন্তু টিভিতে সুবিধাজনক পরিবেশের মুখোমুখি হওয়া আর হোয়াইট হাউসের প্রেস লেকটার্নে দাঁড়িয়ে কঠিন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যে এক বিষয় নয়, তার প্রমাণ জ্যাকারিয়ার প্রথম দিনের ব্রিফিংয়েই ফুটে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে হোয়াইট হাউস বিষয়টি সামাল দিতে গিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে ফেলে। তাকে সমর্থন জোগাতে ও কাজের যোগ্য প্রমাণ করতে একাধিক প্রাক-বান্ধব সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে ঘটল উল্টো ঘটনা। ট্রাম্পের নিজস্ব রক্ষণশীল সমর্থক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের করা কঠিন ও যুক্তিসংগত প্রশ্নের মুখেই তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়েন। সরাসরি ফক্স নিউজের শোন হ্যানিটি তাকে কঠিন সব প্রশ্ন ছুড়ে দেন। গণমাধ্যমের এই প্রতিক্রিয়া থেকেই ট্রাম্প বুঝতে পারেন জ্যাকারিয়া মোটেও তৈরি নন। পরে ট্রাম্প গণমাধ্যমের ওপর জ্যাকারিয়ার এই পরিস্থিতির জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করলেও, মূলত তার নিজস্ব মিত্র সাংবাদিকরাই জ্যাকারিয়ার জীবনবৃত্তান্তের অসত্য তথ্য উন্মোচন করেছিলেন।
সবচেয়ে বড় বিপত্তি তৈরি হয়েছে হোয়াইট হাউসের নিজস্ব বিবৃতি নিয়ে। প্রথম ব্রিফিংয়ের পরপরই হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে দাবি করেছিলেন যে জ্যাকারিয়া দুর্দান্ত সূচনা করেছেন এবং পুরো রুম নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। এমনকি তিনি জ্যাকারিয়াকে ট্রাম্পের মেয়াদের অন্যতম সেরা প্রেস সেক্রেটারি বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
এই একটি ঘটনাই ট্রাম্পের বিশৃঙ্খল নেতৃত্ব এবং সরকার পরিচালনায় অদক্ষতার পুরোনো বিতর্ককে আবার উসকে দিয়েছে। সম্প্রতি করদাতাদের অর্থে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন চালানো কিংবা মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের মতো ট্রাম্পের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো আমেরিকানদের বড় অংশ প্রত্যাখ্যান করেছিল। তা ছাড়া ইলন মাস্ককে সরকারি সংস্থায় একচ্ছত্র আধিপত্য দেওয়া এবং পরবর্তীতে ভুল বুঝে একাধিক কর্মকর্তাকে পুনর্বহাল করার মতো ঘটনাগুলোও তার প্রশাসনের অস্থিরতাকে সামনে এনেছিল।
পররাষ্ট্র নীতি ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের এমন অসংলগ্নতা নতুন নয়। সিনেট থেকে অনুমোদিত হওয়ার পরপরই সিডিসি প্রধান কিংবা আইআরএস কমিশনারকে দ্রুত পদচ্যুত করা কিংবা সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বারবার পরিবর্তন করা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। গত জুলাইয়ে সিএনএনের এক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনার পদ্ধতিতে ৬৫ শতাংশ আমেরিকানই অসন্তুষ্ট, যার মধ্যে বিপুলসংখ্যক স্বতন্ত্র ও রিপাবলিকান ভোটারও রয়েছেন।
স্কারামুচির সংক্ষিপ্ত সময়ের ঐতিহ্যকে জ্যাকারিয়ার এই পাঁচ দিন হয়তো নতুন কোনো মাত্রায় নিয়ে যাবে না, কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে ঘটে যাওয়া ট্রাম্পের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল ভোটারদের কাছে তার বিশৃঙ্খল প্রশাসনের একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে থাকল।