✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৭, | ১৪:৩৬:০৮ |ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী হুতিদের দখলে থাকা অঞ্চল পুনরুদ্ধারে ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান চালাচ্ছে।
তবে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ দখল এবং সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এ অভিযানকে কঠিন করে তুলেছে।
সৌদি আরবের সামরিক সহায়তা অব্যাহত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ আল-মাশিকের কাছে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। হামলার সময় ইয়েমেনের প্রধানমন্ত্রী শায়া আল-জিন্দানি প্রাসাদে উপস্থিত থাকলেও তিনি অক্ষত ছিলেন।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, তাদের অভিযানের লক্ষ্য ছিল একটি সামরিক সদর দফতর। সৌদি আরব-সমর্থিত যোদ্ধা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সহায়তাকারী সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তায়েজের আশপাশে তাদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা সরকারপন্থী বাহিনীর সরবরাহব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হুতিদের কাছ থেকে ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারই সরকারের ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের মূল লক্ষ্য। তবে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় অভিযানের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারপন্থী যৌথ বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল ওয়াদাহ আল-দুবাইশ আল-জাজিরাকে বলেন, হুতিরা নিয়মিতভাবে সরকারি বাহিনীর সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। তবে এতে সরবরাহ বন্ধ হয়নি, ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও চলবে।
তিনি বলেন, হামলার কারণে কোনও কোনও ফ্রন্টে সরঞ্জাম পৌঁছাতে দেরি হতে পারে কিংবা ব্যয় বাড়তে পারে। কিন্তু আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথ এখনও ব্যবহারযোগ্য থাকায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তায়েজ কার্যত অবরুদ্ধ
সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তায়েজ শহরে। হুতিরা শহরটির সঙ্গে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এডেনের প্রধান সড়কটি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। পার্বত্য এলাকার বিকল্প পথগুলোও বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শহরটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক হুতি অগ্রযাত্রার পর তায়েজে জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহে সেখানে পেট্রলের দাম তিন গুণ বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ হারানোয় সরকারি বাহিনীর কাছে গোলাবারুদ, অতিরিক্ত সেনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দর দখল করে হুতিরা। পশ্চিম তায়েজ অঞ্চলে সরকারপন্থী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকেন্দ্র ছিল বন্দরটি। পরে পাল্টা অভিযানে কিছু এলাকা পুনর্দখল করতে পারলেও মোখার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়নি সরকারি বাহিনী।
ইয়েমেনের উপপ্রতিমন্ত্রী ফয়সাল আল-মাজিদি বলেন, বিচ্ছিন্ন ফ্রন্টগুলোর মধ্যে সরবরাহ সচল রাখতে সরকারপন্থী বাহিনী বিকেন্দ্রীকরণ ও বিকল্প রুট ব্যবহারের কৌশল নিয়েছে। শাবওয়া, মারিব, তায়েজের হুতিমুক্ত এলাকা এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোকে কেন্দ্র করে সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সুরক্ষিত রাখতে কৌশলগত উঁচু এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সৌদি সহায়তা ও সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ
‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান শুরুর পর ইয়েমেনের সরকার ও মিত্র বাহিনীর প্রতি সৌদি আরবের সমর্থন বেড়েছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার বিষয়টিও স্বীকার করেছে রিয়াদ।
আল-দুবাইশের মতে, ইরানের সরবরাহ করা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ উন্নত সামরিক সক্ষমতা এবং বিপুলসংখ্যক যোদ্ধার কারণে হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, অক্টোবরের শুরু থেকে চালানো বিমান হামলায় হুতিদের শত শত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে।
তবে অভিযান সফল করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সরকারপন্থী বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা। ভিন্ন ভিন্ন কমান্ড কাঠামোর অধীনে পরিচালিত এসব বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে গত সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো যায়নি বলে মনে করা হচ্ছে।
জানুয়ারিতে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল সব হুতিবিরোধী সামরিক ইউনিটকে একক কমান্ডের আওতায় আনতে সুপ্রিম মিলিটারি কমিটি (এসএমসি) গঠন করে। তবে বাহিনীগুলোর অর্থায়ন ও নেতৃত্ব কাঠামোয় দীর্ঘদিনের পার্থক্য এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি।
ইয়েমেনের সামরিকবিষয়ক গবেষক আদনান আল-জাবারনি অবশ্য মনে করেন, বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ছে। তার মতে, হুতিরা সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারকে চাপে ফেলতে বেসামরিক স্থাপনা ও সরবরাহপথে হামলা চালালেও এতে হুতিবিরোধী অভিযান আরও জোরদার হতে পারে।
তবে তায়েজের অবরোধ ভাঙা, সরবরাহপথ পুনরুদ্ধার এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সরকারপন্থী বাহিনীর অগ্রযাত্রা ধরে রাখা কঠিন হবে। ফলে সৌদি সহায়তার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ই ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের সাফল্যের প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা