✕


বিনা পারিশ্রমিকে ৪৫ বছর ধরে কবর খুঁড়ছেন আবদুল কুদ্দুছ

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১০-০৫, | ১৩:৩৪:০৭ |

কারও মৃত্যুসংবাদ শুনলেই হাতে ঝুড়ি-কোদাল নিয়ে ছুটে যান তিনি। স্বজনদের অপেক্ষায় না থেকে নেমে পড়েন কবর খোঁড়ার কাজে। বিনিময়ে নেন না কোনো পারিশ্রমিক। এভাবেই টানা ৪৫ বছর ধরে মানুষের শেষ ঠিকানা কবর প্রস্তুত করে আসছেন কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার মনপাল গ্রামের আবদুল কুদ্দুছ।

৬০ পেরোনো আবদুল কুদ্দুছ পেশায় একজন দিনমজুর। হ্যাংলা-পাতলা গড়নের এই মানুষটির উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি। দিনমজুরির কাজ করেই চলে তার সংসার। কিন্তু নিজের রোজগারের কথা না ভেবে মানুষের প্রয়োজনে ছুটে যাওয়াই যেন তার জীবনের অন্যতম ব্রত। শুধু কবর খোঁড়াই নয়, গ্রামের মসজিদও নিজের উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন তিনি।

মনপাল গ্রামসহ আশপাশের প্রায় ১০ গ্রামের মানুষ তাকে চেনেন ‘কবর খোঁড়ার মানুষ’ হিসেবে। কোনো বাড়িতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে কিংবা মসজিদের মাইকে মৃত্যুসংবাদ ভেসে এলে তিনি আর দেরি করেন না। কাজ ফেলে ঝুড়ি ও কোদাল নিয়ে ছুটে যান সেখানে। গত ৪৫ বছরে এভাবে পাঁচ শতাধিক কবর খুঁড়েছেন বলে জানান তিনি।

কাজ ফেলে ছুটে যান কবর খুঁড়তে
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, আবদুল কুদ্দুছ মূলত মাটি কাটা ও কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। দিনের মজুরির ওপরই নির্ভর করে তার সংসার। কোথাও মাটি কাটার কাজ করছেন, এমন সময়ও যদি কারও মৃত্যুর খবর পান, তাহলে নিজের কাজের কথা ভুলে ছুটে যান মৃতের বাড়িতে।

মৃতের স্বজনরা তাকে খবর দেওয়ার আগেই অনেক সময় তিনি ঝুড়ি-কোদাল নিয়ে হাজির হয়ে যান। কবর খুঁড়তে গিয়ে কোনো কোনো দিন তার নিজের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তবুও এ নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই।

সম্প্রতি মনপাল গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় জয়নাল আবেদীনের স্ত্রী মারা গেলে সকালেই কবর খুঁড়তে চলে যান আবদুল কুদ্দুছ। মাটি খোঁড়ার কাজে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। মাঝে মাঝে প্রতিবেশী ও মৃতের স্বজনরাও তাকে কবর খোঁড়ার কাজে সহযোগিতা করেন।

শুরুটা যেভাবে
আবদুল কুদ্দুছ জানান, ১৯৮০-৮১ সালের দিকে কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করেন তিনি। গ্রামের মুরব্বি পূর্বপাড়ার রব্বন আলীর কবর খোঁড়ার কাজ দেখেই এ কাজে আগ্রহী হন। পরে রব্বন আলীর জামাতা তৌহিদ মিয়ার সঙ্গে কবর খোঁড়ার কাজে যুক্ত হন। তৌহিদ মিয়া মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি নিজেই নিয়মিত এ কাজ করে আসছেন।

আবদুল কুদ্দুছ বলেন, ‘১৯৮০-৮১ সাল থেকে কবর খুঁড়ে আসছি। প্রথমে গ্রামের মুরব্বিদের কাছ থেকে এ কাজ শিখেছি। এরপর থেকে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে চলে যাই। আমাদের উত্তরদা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আমাকে যেতে হয়। আমি আল্লাহকে খুশি করার জন্য এসব কাজ করি। এসব কাজ করে আমি আনন্দ পাই। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ কাজ করে যেতে চাই।’

সম্মানীও নেন না
আবদুল কুদ্দুছের এই কাজের বিনিময়ে অনেকে সম্মানী দিতে চান। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই তিনি তা নিতে চান না। তার কাছে কবর খোঁড়া কোনো পেশা নয়; বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ।

স্থানীয় বাসিন্দা অহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আবদুল কুদ্দুছ দীর্ঘদিন ধরে কবর খুঁড়ে আসছেন। মনপালসহ আশপাশের গ্রামের মানুষের স্বজন মারা গেলে কবর খোঁড়া নিয়ে তাদের আর দুশ্চিন্তা করতে হয় না। তিনি নিজে থেকেই হাজির হয়ে যান। শুধু কবর খোঁড়াই নয়, গ্রামের কেন্দ্রীয় মসজিদও তিনি নিজের উদ্যোগে পরিষ্কার করেন।’

স্থানীয় সমাজসেবক ওবায়দুল হক মজুমদার বলেন, ‘আবদুল কুদ্দুছ খুবই স্বল্প আয়ের মানুষ। তারপরও মানুষের জন্য নিজের সময় ও শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। কবর খোঁড়ার পর তাকে সম্মানী দিতে চাইলে অনেক সময় তিনি নেন না। তার মতো পরোপকারী মানুষ আমাদের সমাজে খুবই বিরল। সমাজে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা আরও বাড়ানো দরকার।’

মানুষের সেবাতেই তার আনন্দ
মনপাল কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব মাওলানা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আবদুল কুদ্দুছ খুবই সহজ-সরল, ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে পড়ার চেষ্টা করেন। দীর্ঘদিন ধরে বিনা পারিশ্রমিকে কবর খুঁড়ে আসছেন। সামাজিক যেকোনো কাজেও তিনি সবার আগে ছুটে যান।’

তিনি আরও বলেন, ‘আবদুল কুদ্দুছ আমাদের বলেছেন, আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টির প্রত্যাশায় তিনি এসব কাজ করেন। মানুষের বিপদের সময় পাশে দাঁড়াতে পারাটাই তার কাছে আনন্দের। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে এর উত্তম প্রতিদান দেবেন।’

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..