✕


কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত নাসা’র সুইফট টেলিস্কোপ, ব্যর্থ উদ্ধার অভিযান

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১০-০১, | ১৪:৩৯:৫৯ |

মহাকাশ গবেষণায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অনন্য ভূমিকা রাখা মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র ঐতিহাসিক নিল গেহেরেলস সুইফট অবজারভেটরি বা সুইফট মহাকাশ টেলিস্কোপটি তার কার্যকালের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিজেদের উচ্চতা হারিয়ে এটি এখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে খসে পড়ার শেষ প্রহর গুনছে। উৎক্ষেপণের প্রায় ২২ বছর পর কক্ষপথ পুনর্নির্ধারণের একটি অতি ঝুঁকিভিত্তিক উদ্ধার অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে নিশ্চিত হয়ে পড়েছে মহাকাশের এই পর্যবেক্ষণকেন্দ্রটির করুণ পরিণতি।

নাসার তথ্য অনুযায়ী, ৩২০০ পাউন্ড বা প্রায় ১৪৫২ কেজি ওজনের এই মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি বর্তমানে পৃথিবী থেকে আনুমানিক ২০০ মাইল বা ৩২৫ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থান করছে। প্রকৌশলীরা পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, আগামী অক্টোবর মাসের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে এটি ১৮৫ মাইল বা ৩০০ কিলোমিটারের নিচে নেমে আসবে। এই নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে গেলে এর স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম চালানো একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে। ফলস্বরূপ, খুব শিগগিরই এর সব ধরনের বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন বিজ্ঞানীরা। সেখান থেকে আর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব হবে না এবং শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর ঘন বায়ুমণ্ডলে তীব্র বেগে প্রবেশের পর বায়ুমণ্ডলীয় ঘর্ষণে এটি পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা লিও ল্যাবস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, টেলিস্কোপটির আকারের কারণে এর কিছু ধাতব অংশ হয়তো সম্পূর্ণ পুড়ে না গিয়ে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে। তবে এতে জনবহুল এলাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা মানুষের শারীরিক আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত ক্ষীণ। অন্যান্য মহাকাশ বর্জ্যের মতোই এর সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ হয়তো নির্জন এলাকা কিংবা মহাসাগরের বুকে গিয়ে আছড়ে পড়বে।

সুইফট টেলিস্কোপটিকে আরও বহু বছর সচল রাখা ও অক্ষত অবস্থায় মহাকাশে টিকিয়ে রাখার জন্য অ্যারিজোনা-ভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ক্যাটালিস্ট স্পেস টেকনোলজিস একটি সাহসী এবং অভূতপূর্ব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। মাত্র নয় মাসের মধ্যে লিংক নামের একটি ছোট উদ্ধারকারী স্যাটেলাইট তৈরি ও গত জুলাই মাসের শুরুতে উৎক্ষেপণ করা হয়। পরিকল্পনা ছিল লিংক স্যাটেলাইটটি সুইফটকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কিছুটা উপরের দিকে ঠেলে একটি নিরাপদ ও স্থায়ী কক্ষপথে তুলে দেবে। কিন্তু মহাকাশে পৌঁছানোর পরপরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লিংক স্যাটেলাইটটি ঘুরতে শুরু করায় উদ্ধার অভিযানটি বড় ধরনের ধাক্কা খায়।

পরবর্তীতে ক্যাটালিস্টের প্রকৌশলীরা নতুন সফটওয়্যার আপলোড করে এবং থ্রাস্টার ব্যবহার করে স্যাটেলাইটের সেই আকস্মিক ঘূর্ণন থামাত সক্ষম হলেও সেই প্রক্রিয়ায় নষ্ট হয়ে যায় এর সিংহভাগ জ্বালানি। ফলে মহাকাশযানের জ্বালানি ঘাটতি দেখা দেওয়ায় মূল লক্ষ্য অর্থাৎ সুইফটকে টেনে ওপরে তোলার পরিকল্পনাটি নাসার সাথে আলোচনার মাধ্যমে বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে এটিকে একটি 'ডেমোনস্ট্রেশন' বা পরীক্ষামূলক মহাকাশ মহড়া হিসেবে রূপান্তর করা হয়। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে লিংক স্যাটেলাইটটি সুইফটের প্রায় সাড়ে সাত থেকে নয় মাইলের কাছাকাছি পৌঁছায় এবং পরবর্তীতে এর তিনটি রোবোটিক বাহু প্রসারিত করে একটি অ-পরিচর্যাযোগ্য মহাকাশযানকে ধরার প্রযুক্তি পরীক্ষা করে। দীর্ঘ ৮৫ দিন কক্ষপথে থাকার পর গত ২৫ সেপ্টেম্বর লিংক স্যাটেলাইটটি নিজেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে ধ্বংস হয়ে যায়।

২০০৪ সালের নভেম্বরে উৎক্ষেপণ করা এই সুইফট দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি ছিল মহাকাশবিজ্ঞানের এক অনন্য আবিষ্কার। ক্ষিপ্রগতির পাখির নামে নামাঙ্কিত এই টেলিস্কোপটি সেকেন্ডের মধ্যে ঘুরে গিয়ে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং আকস্মিক বিস্ফোরণ ‘গামা-রে বার্স্ট’ পর্যবেক্ষণ করতে পারতো। এছাড়া কৃষ্ণগহ্বরের প্রজ্জ্বলন, ধুমকেতু এবং গ্রহাণুর ছবি তুলতেও এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। বিগত দুই বছরে সূর্যের ১১ বছরের চক্রের সর্বোচ্চ সক্রিয়তার কারণে তীব্র সৌরঝড় ও প্লাজমা নির্গমনের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রসারণ ঘটে, যার ফলে সুইফটের ওপর বায়ুমণ্ডলীয় টান বা ড্র্যাগ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায় এবং এর উচ্চতা দ্রুত কমতে শুরু করে।

উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি সাফল্য না পেলেও নাসা এবং ক্যাটালিস্ট স্পেস যৌথভাবে এই অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করছে। তাদের মতে, মাত্র নয় মাসে এই ধরণের জটিল স্যাটেলাইট তৈরি ও পরিচালনা মহাকাশে রোবোটিক সার্ভিসিং প্রযুক্তির নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। জীবনের শেষ দিনগুলোতে নাসা সুইফটের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলো সাময়িকভাবে সচল করে শেষ মুহূর্তের তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করছে, যদিও এতে টেলিস্কোপটির বিচ্যুতি আরও কিছুটা ত্বরান্বিত হচ্ছে। একটি ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক যুগের সমাপ্তি ঘটিয়ে খুব শীঘ্রই সুইফট নিজের কক্ষপথ ছেড়ে পৃথিবীর বুকে শেষবিদায় জানাবে।

সূত্র: সিএনএন

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..