✕


বিষাক্ত ইনজেকশনের দুই ডোজের পরও জীবিত নারী, যুক্তরাষ্ট্রে হুলস্থুল

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১০-০১, | ১৪:৩৪:৪৩ |

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ১৯৯৫ সালের এক হত্যাকাণ্ডের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দি ক্রিস্টা গেল পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে নজিরবিহীন ব্যর্থতার মুখ দেখেছে কারাকর্তৃপক্ষ। বিষাক্ত ইনজেকশনের দুটি নির্ধারিত ডোজ প্রয়োগের পরও মৃত্যু হয়নি তার। চরম গোলযোগের মুখে শেষ পর্যন্ত টেনেসি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর বিল লি চলতি বছরের জন্য সব ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত ঘোষণা করেছেন। 

৫০ বছর বয়সী ক্রিস্টা পাইক বর্তমানে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও বিরল ব্যর্থতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ঘটনার বিশদ বিবরণ বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সহপাঠীকে নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে ক্রিস্টা পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। গত বুধবার সকাল দশটায় ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটে টেনেসি অঙ্গরাজ্যে গত ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল। তবে কার্যকরের মাত্র এক ঘণ্টা আগে ষষ্ঠ ইউএস সার্কিট আপিল আদালত পাইকের শৈশবের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টি আদালতে সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয়েছিল কি না; তা খতিয়ে দেখার জন্য এক ঘণ্টার এক স্থগিতাদেশ প্রদান করে। পরবর্তীতে রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদনের প্রেক্ষিতে দেশটির মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আপিল আদালতের দেওয়া সেই স্থগিতাদেশ খারিজ করে দিলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সবুজ সংকেত পায় প্রশাসন।

প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদকর্মীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সন্ধ্যা ৭টা ২৭ মিনিটে কার্যকর কক্ষের পর্দা তোলা হলে পাইককে একটি সুনির্দিষ্ট বিছানায় বা গ্যারানিতে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়। ওষুধ প্রয়োগের এক পর্যায়ে পাইক সজাগ হয়ে মাথা উঁচু করেন এবং কারারক্ষীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তোলেন যে তার হাতটি অস্বাভাবিক অনুভব হওয়ার কথা কি না। রাত ৮টা ২৬ মিনিটে পেন্টোবার্বিটালের দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ সম্পূর্ণ হলেও পাইক তখনও জীবিত ছিলেন এবং তার বিকট নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে রাত ৮টা ৫৩ মিনিটে মাইকের সংযোগ কেটে দেওয়া হয় এবং সাংবাদিকদের মৃত্যুদণ্ড এলাকা ত্যাগ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এর কিছু পরেই গভীর রাতে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

এই চরম অব্যবস্থাপনার পর ক্রিস্টা পাইকের আইনজীবীরা অবিলম্বে জরুরি রিট আবেদন দাখিল করেন। তারা দাবি করেন, এই অকার্যকর মৃত্যুদণ্ড চেষ্টা পাইককে চরম অমানবিক যন্ত্রণার মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা মার্কিন সংবিধানের ক্রুয়েল অ্যান্ড আনইউজুয়াল পানিশমেন্ট বা নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তিবিরোধী অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা কারাকর্তৃপক্ষকে পাইকের জীবন রক্ষার্থে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান।

এ ঘটনার পর টেনেসি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর বিল লি এক বিবৃতিতে জানান, ঠিক কী ঘটেছিল তা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করতে একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। গভর্নর স্পষ্ট করে দেন যে এই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলতি বছরে টেনেসিতে আর কোনো সাজা কার্যকর করা হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আইনসম্মত শাস্তি বাস্তবায়ন করা রাজ্যের জন্য একটি বড় দায়িত্ব, তবে তা অবশ্যই কার্যকর এবং সাংবিধানিক নিয়ম মেনে হতে হবে। অন্যদিকে টেনেসির কারা বিভাগ দাবি করেছে, তারা রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের অনুমোদিত আইনের প্রতিটি ধাপ নিখুঁতভাবে অনুসরণ করেছে। উল্লেখ্য, রাজ্যের নিয়মে দুই ডোজ ওষুধ প্রয়োগের পরও বন্দি জীবিত থাকলে করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না।

ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক রবিন এম মাহের ঘটনাটিকে অত্যন্ত বিরল আখ্যা দিয়ে বলেন, ইতিপূর্বে কেবল রগ খুঁজে না পাওয়ার কারণে চিকিৎসাঘটিত জটিলতায় মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখার ঘটনা ঘটলেও, ইনজেকশনের পুরো ডোজ শরীরের ভেতর যাওয়ার পরও কেউ বেঁচে থাকার এমন ঘটনা পূর্বে কখনো ঘটেনি। এর আগে চলতি বছরের মে মাসেও তিনজনের হত্যাকারী টনি কারুথার্স নামের এক বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় টানা এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে রগ খুঁজে না পেয়ে কাজ স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল রাজ্য প্রশাসন।

হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও বিচারিক ইতিহাস বেশ চাঞ্চল্যকর। ১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি নক্সভিলের এক জব ট্রেনিং সেন্টারের ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ক্রিস্টা পাইক তার প্রেমিক ট্যাডরিস শিপকে নিয়ে আরেক সহপাঠী ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমায়ারের ওপর আক্রমণ চালান। প্রেমিককে ছিনিয়ে নেওয়ার সন্দেহে স্লেমায়ারকে বনাঞ্চলে ডেকে নিয়ে গিয়ে বক্স কাটার দিয়ে আঘাত করা হয় এবং মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার সময় পাইকের ১৭ বছর বয়সী প্রেমিক শিপ ভিকটিমের শরীরে একটি পেন্টাগ্রাম বা শয়তান পূজার প্রতীক খোদাই করে দেয়। এই ঘটনার দায়ে শিপকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও একমাত্র পাইককেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে পাইকের বাইপোলার ডিসঅর্ডার এবং পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার ধরা পড়ে। এতদিন ধরে পাইকের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়ে আসছিলেন যে, অপরাধের সময় তার মানসিক অসুস্থতা, চরম শৈশব নির্যাতন এবং মাত্র ১৮ বছর বয়সের বিষয়টি আদালতে সঠিকভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তবে ভিকটিম কলিন স্লেমায়ারের মা মে মার্তিনেজ কয়েক দশক ধরে নিজের মেয়ের বিচার এবং পাইকের মৃত্যুদণ্ডের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১৮ জন নারী বন্দির ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, যা মোট সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ। 

সূত্র: সিএনএন

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..