✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-২০, | ০১:২৭:৪৩ |ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছে অত্যন্ত গভীরে নির্মিত গোপন ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ বা ‘কুহ-ই কোলং গাজ লা’ আবারও আন্তর্জাতিক সংবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক উপগ্রহ চিত্রে স্থানটিতে রেকর্ড মাত্রার নির্মাণকাজ এবং নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপস্থিতি দেখা গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাবিদ ও গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রাইজিং’ এবং ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর মাধ্যমে ইরানজুড়ে একাধিক পারমাণবিক অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা চালানো হলেও এই পাহাড়ি স্থাপনাটি আঘাতের বাইরেই থেকে যায়। এখন প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বাঙ্কার-বিধ্বংসী বোমা দিয়েও কি আদৌ এই ভূগর্ভস্থ দুর্গ ধ্বংস করা সম্ভব?
ফার্সি ভাষায় ‘কুহ-ই কোলং গাজ লা’ নামে পরিচিত এই পিকঅ্যাক্স পর্বতটি নাতাঞ্জের মূল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে সামান্য দক্ষিণে অবস্থিত। গত বছর আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলায় নাতানজ, ফোরদো ও ইসফাহানের মতো পারমাণবিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে কোনো হামলা চালানো হয়নি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সামরিক অভিযানের পর থেকে এই স্থানে নির্মাণকাজ অভূতপূর্ব গতি পেয়েছে এবং এটি স্থাপনাটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছে। উপগ্রহ বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, স্থানটিতে যোগাযোগ সড়ক তৈরি, প্রবেশপথের চারপাশে সুসংহত নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ এবং ভূগর্ভস্থ খননকাজ দ্রুত বাস্তবায়নের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের কোনো প্রবেশাধিকার নেই, যার ফলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ২০২০ সালে যখন এখানে কাজ শুরু হয়, তখন তেহরান জানিয়েছিল যে এটি একটি উন্নত সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন কারখানা হবে। তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, নাতাঞ্জে ধ্বংসপ্রাপ্ত গবেষণা কার্যক্রম স্থানান্তরের পাশাপাশি এখানে উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিরাপদ সংরক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে যে, তেহরান ইতোমধ্যে এই পাহাড়ি গুহার গভীরে সেন্ট্রিফিউজ স্থানান্তর করতে শুরু করেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের হামলায় এই স্থাপনাটিকে লক্ষ্যবস্তু না করার প্রধান কারণ ছিল এর অনন্য ভৌগোলিক গভীরতা ও সুরক্ষিত অবস্থান। এটি শক্ত গ্রানাইট পাথরের পাহাড়ের প্রায় ৮০ থেকে ১০০ মিটার নিচে নির্মিত, যা ভূগর্ভস্থ ফেরদো স্থাপনার চেয়েও অনেক বেশি গভীর। মার্কিন বিমানবাহিনীর বহরে থাকা সর্বাধুনিক ও শক্তিশালী বাঙ্কার-বিধ্বংসী অস্ত্র ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের ‘জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনেট্রেটর’ (এমওপি), যা বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান থেকে নিক্ষেপ করা হয়, তা-ও এত গভীর গ্রানাইট শিলার স্তর ভেদ করতে সক্ষম কি না তা নিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ ছাড়াও এর সুড়ঙ্গ সংযোগগুলো ইংরেজি ‘ইউ’ অক্ষরের মতো করে তৈরি করা হয়েছে, যাতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণের ধাক্কা মূল ভূগর্ভস্থ কক্ষে প্রবেশ করতে না পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে এই স্থানে হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে আসছেন এবং নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে ইরানি নেতৃত্বের সফরকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি জানিয়েছে, গত জুলাই ও আগস্ট মাসে সুড়ঙ্গের পশ্চিম প্রবেশপথের রাস্তায় ইরান মাটির বড় প্রতিরক্ষা বাঁধ তৈরি করেছে, যাতে হঠাৎ হামলা বা ভূগর্ভে দ্রুত প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করা যায়। ওয়াশিংটনের জন্য সামরিক বিকল্পগুলো অত্যন্ত সীমিত হওয়ায়, কিছু সামরিক বিশ্লেষক মনে করেন যে সম্পূর্ণ স্থাপনাটি ধ্বংস করার চেষ্টা না করে মার্কিন বাহিনী হয়তো এর প্রবেশপথগুলোতে হামলা চালিয়ে মুখগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করতে পারে, যাতে ইরান দীর্ঘকালের জন্য এর ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হয়।
আইএইএ বারবার এই স্থাপনাটি পরিদর্শনের দাবি জানালেও তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করে চলেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিগুলোকে অনির্ণায়ক উল্লেখ করে জাতিসংঘের নিরপেক্ষ পরিদর্শনের আহ্বান জানালেও বাস্তবে পরিদর্শকদের ওপর বিধিনিষেধ জারি থাকায় প্রকৃত পরিস্থিতি এখনো ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হলো, কেবল বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি বা উচ্চ গভীরতায় সুরক্ষিত অবকাঠামো ধ্বংস করা কোনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনবে না; দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ফল পেতে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার বিকল্প নেই।
সূত্র: আরব নিউজ