✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-২০, | ০১:১৮:৪১ |মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার একটি নতুন এবং অত্যন্ত কঠোর রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিলে স্বাক্ষর করে এটিকে আইনে পরিণত করেছেন। রাশিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশটির জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে এই আইন তৈরি করা হয়েছে, যে খাতের অর্জিত অর্থ দিয়ে মূলতঃ ইউক্রেনে অব্যাহত সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে মস্কো।
একই সাথে ইরানের জ্বালানি ও অস্ত্র খাতের ওপরও পূর্বের নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারিত করা হয়েছে এই বিলে। কিয়েভ সরকার এটিকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নতুন এই আইনটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে বিলে রাশিয়ার ওপর কঠোর পদক্ষেপের কথা বলা হলেও তা ট্রাম্পকে অনিয়ন্ত্রিত শুল্ক আরোপের এক অভূতপূর্ব ক্ষমতা প্রদান করায় যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নতুন অনুমোদিত এই 'লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংকশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬' নামের আইনটি ট্রাম্পকে এমন কোনো দেশের ওপর শতভাগ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের একক অধিকার দিয়েছে, যারা রাশিয়া থেকে নতুন করে অপরিশোধিত তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস কিনবে। তাছাড়া গত ১২ মাসে রাশিয়ান তেল বা গ্যাসের শীর্ষ পাঁচটি আমদানিকারক দেশের অন্তর্ভুক্ত যেকোনো রাষ্ট্রও এই শুল্কের আওতায় আসতে পারে।
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে রাশিয়ান তেল ও গ্যাসের শীর্ষ তিনটি ক্রেতা দেশ ছিল চীন, ভারত ও তুরস্ক। ট্রেড পলিসি বিশেষজ্ঞ ডেবোরা এলমসের মতে, বিলটিতে শুল্ক আরোপের অত্যন্ত ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং এমন একটি প্রশাসনের হাতে এটি তুলে দেওয়া হয়েছে যা পূর্বেও বাণিজ্য আইন প্রয়োগে বেশ আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়েছে। আদালতের আইনি চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যেকোনো দেশের ওপর শতভাগ শুল্ক বসানোর এই প্রশাসনিক স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আইনটি পাসের প্রক্রিয়াতেই আইনপ্রণেতাদের মাঝে গভীর মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মার্কিন হাউসে এটি ২৬২-১৫৯ ভোটে পাস হয়, যেখানে মূলতঃ রিপাবলিকানদের সিদ্ধান্তের সাথে একমত হয়ে ৫৮ জন ডেমোক্র্যাটও বিলটির পক্ষে ভোট দেন। তবে প্রতিনিধি পরিষদের মাইনোরিটি লিডার হাকিম জেফ্রিসের নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মূল নেতৃত্ব বিলটির তীব্র বিরোধিতা করেন। জেফ্রিস মন্তব্য করেন, ট্রাম্পকে ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সংক্রান্ত এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত শুল্ক ক্ষমতা দেওয়া মানে সাধারণ আমেরিকান পরিবারগুলোর ওপর চরম অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। তিনি হুশিয়ারি দেন যে এই শুল্ক প্রয়োগের ফলে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে।
একই সুর শোনা গেছে ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি গ্রেগরি মিকস এবং আইনপ্রণেতা ডন বায়ারের কণ্ঠে। মিকস দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার যৌক্তিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি আমেরিকান জনগণকে যেন অনিয়ন্ত্রিত শুল্কের কবল থেকে রক্ষা করা যায়, সে ধরনের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা বা সুরক্ষা ব্যবস্থা বিলে রাখা হয়নি। আইনপ্রণেতা ডন বায়ার বিষয়টিকে একটি মারাত্মক ভুল হিসেবে চিহ্নিত করে দাবি করেন যে, ইতিপূর্বে ট্রাম্প প্রতিবারই কংগ্রেস থেকে প্রাপ্ত শুল্ক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং মার্কিন মিত্রদেরও শুল্কের নিশানা বানিয়েছেন। বিচার বিভাগীয় নজরদারি ছাড়া এবং মেয়াদবিহীন এ ধরনের ক্ষমতা মার্কিন এবং ইউক্রেনীয় উভয় পক্ষের জন্যই উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতি ডেকে আনতে পারে বলে তিনি সতর্ক করে দেন।
অন্যদিকে বিলটির পক্ষে থাকা আইনপ্রণেতারা মস্কোকে পুরোপুরি অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ওপর জোর দিয়েছেন। হাউস ইউক্রেন ককাসের সহ-সভাপতি ও ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি মার্সি কাপ্তুর মনে করেন, রাশিয়াকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে এবং যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এই মুহূর্তের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো এই কঠোর আইনটি। তিনি জানান যে ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ বিলে ট্রাম্পকে দেওয়া এই নতুন ক্ষমতার ব্যবহার কীভাবে করা হচ্ছে তার ওপর সার্বক্ষণিক তীক্ষ্ণ নজর রাখবে। একই সাথে প্রতিনিধি স্টেনি হোয়ার বিলে সমর্থন জানিয়ে বলেন যে, এটি ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার যে প্রতিশ্রুতি আমেরিকা দিয়েছিল, তা পূর্ণ করার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই বিলের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে। বিশেষ করে চীন এবং ভারত রাশিয়ান তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় এই নতুন আইন দুটি দেশের ওপর বড় ধরনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা দিতে যাচ্ছে। ট্রাম্পের তৈরি করা সম্ভাব্য এই শুল্কের জেরে এখন চীন ও ভারতকে তাদের জ্বালানি ক্রয়ে বিকল্প উৎস খুঁজতে হতে পারে বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন ইতিমধ্যেই মার্কিন পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে গিয়ে মার্কিন সরকারের এই একতরফা সিদ্ধান্ত ও শুল্ক নীতির তীব্র বিরোধিতা করছে বেইজিং। সামনেই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফর এবং দুই দেশের শীর্ষ অর্থনৈতিক কর্তাদের বৈঠকের মুহূর্তে এই আইন সম্পর্কের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলল।
অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রেও বিলটি বাধার প্রাচীর তৈরি করছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে তারা পরিস্থিতির ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখছে এবং তাদের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। একই সাথে তারা বিষয়টি নিয়ে আমেরিকার সাথে ইতিপূর্বে আলোচনার কথা উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এর মারাত্মক পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতে যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির কথা চলছিল, বিশ্লেষকদের মতে নতুন এই অসীম শুল্ক কাঠামোর ভয়ে সেই চুক্তি চুড়ান্ত হওয়া এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল। সর্বসাকুল্যে, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে গিয়ে ওয়াশিংটন এমন এক নীতি গ্রহণ করেছে যা কেবল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে।
সূত্র: টাইম