✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-১৭, | ০১:০৭:২৪ |দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের বিস্তীর্ণ অভ্যন্তরীণ অঞ্চলকে সমুদ্রপথের সঙ্গে আরও দ্রুত যুক্ত করতে চালু হচ্ছে দেশটির আধুনিক নদী-সমুদ্র সংযোগকারী প্রথম খাল—পিংলু খাল। বুধবার নৌযান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে ১৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলপথ।
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় অর্থনীতি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে দেশটির ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যে এই খাল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
পিংলু খাল পুরোপুরি চীনের দক্ষিণাঞ্চলের গুয়াংসি অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। ভিয়েতনামের সীমান্তবর্তী এই অঞ্চল দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে মুখ করে রয়েছে। নতুন জলপথটি পশ্চিম নদী বা শিজিয়াং নদীকে বেইবু উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বেইবু উপসাগর টনকিন উপসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশ, যা দক্ষিণ চীন ও উত্তর ভিয়েতনামের মধ্যবর্তী সমুদ্রাঞ্চলে অবস্থিত।
এই খাল চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান ও গুইঝৌসহ সমুদ্র থেকে দূরের বিভিন্ন প্রদেশের পণ্য অনেক কম দূরত্বে সমুদ্রবন্দরে পৌঁছাতে পারবে। সেখান থেকে পণ্য সরাসরি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো সম্ভব হবে।
৫৬০ কিলোমিটার পথ কমবে
পিংলু খাল নির্মাণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে দূরত্ব ও পরিবহন ব্যয় কমে যাওয়া। গুয়াংসি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বাজারে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব প্রায় ৫৬০ কিলোমিটার কমবে।
একই সঙ্গে লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহন ব্যয় ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
গুয়াংসি সরকারের উপমহাসচিব ঝাং ঝিওয়েনের হিসাব অনুযায়ী, শুধু পরিবহন ব্যয় কমার কারণে প্রতিবছর ৫০০ কোটি ইউয়ানের বেশি সাশ্রয় হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ইউয়ান ১৮.৩৪ টাকা দরে)।
গুয়াংসির ভাইস চেয়ারওম্যান লু সিনিং এই অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোকে ‘দৃশ্যমান লাভ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, পরিবহন ব্যয় কমলে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমবে এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—দুই ধরনের বাণিজ্যই বাড়বে।
খালটিতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজ চলাচল করতে পারবে। প্রকল্পটির আনুমানিক নির্মাণ ব্যয় ৭২৭০ কোটি ইউয়ান, যা প্রায় ১০ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
বেল্ট অ্যান্ড রোডের সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর বাণিজ্যপথ
পিংলু খালকে শুধু একটি স্থানীয় জলপথ হিসেবে দেখছে না চীন। এটি দেশটির নিউ ইন্টারন্যাশনাল ল্যান্ড-সি ট্রেড করিডর বা নতুন আন্তর্জাতিক স্থল-সমুদ্র বাণিজ্য করিডরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই করিডরের মাধ্যমে চীনের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহর ও শিল্পাঞ্চলকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। বৃহত্তর এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে চংকিং, সিচুয়ান প্রদেশের চেংদু, গুইঝৌ ও ইউনানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গেও এই স্থল-সমুদ্র বাণিজ্য করিডরের যোগসূত্র রয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় সড়ক, রেলপথ, বন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীনকে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বাজারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পিংলু খাল সেই বৃহত্তর নেটওয়ার্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে কাজ করবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ছে
চীন যখন নতুন এই জলপথ চালু করছে, ঠিক সেই সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে দেশটির বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে।
চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৩৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা প্রায় ৬৪০ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বাণিজ্য বেড়েছে ১৮ দশমিক ২ শতাংশ।
এই ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের পটভূমিতে পিংলু খাল চালু হওয়ায় চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে পণ্য পাঠানোর সময় ও ব্যয় উভয়ই কমতে পারে।
খালের দক্ষিণ প্রান্তে থাকা বেইবু গালফ বন্দরের সক্ষমতাও গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৭ সালে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ছিল ২২ লাখ ৮০ হাজার টিইইউ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬ লাখ টিইইউতে। বন্দরটির সমুদ্রপথ নেটওয়ার্কও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
খালকে ঘিরে শিল্পাঞ্চল গড়ার পরিকল্পনা
পিংলু খালকে শুধু পণ্য পরিবহনের পথ হিসেবে ব্যবহার করতে চায় না গুয়াংসি। খালকে কেন্দ্র করে তারা গড়ে তুলতে চাইছে ‘পিংলু ক্যানাল ইকোনমিক বেল্ট’।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো খালের আশপাশে নতুন শিল্প স্থাপন, বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামোর সঙ্গে উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে যুক্ত করা এবং সরবরাহব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করে তোলা।
প্রস্তাবিত শিল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে অলৌহঘটিত ধাতু ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, আধুনিক পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি।
বন্দরসংলগ্ন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ফলে কারখানা থেকে পণ্য বন্দরে নেওয়ার দূরত্বও কমবে। এতে উৎপাদন, পরিবহন ও রফতানি—তিনটি পর্যায়েই সময় ও খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ইতোমধ্যে নতুন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পরিবহনকেন্দ্র চংকিং থেকে সোডিয়াম বিসালফেটবোঝাই একটি ট্রেন গুয়াংসির রাজধানী নানিংয়ের বন্দরে পৌঁছেছে।
খাল চালুর পর দক্ষিণ ভিয়েতনামের ক্যান থো বন্দরের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল শুরু করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রথমে বিনা খরচে, পরে টনপ্রতি এক ইউয়ান
পিংলু খাল দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ধাপে ধাপে মাশুল নির্ধারণ করেছে গুয়াংসি কর্তৃপক্ষ।
২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলো খালের তিনটি জলকপাট বিনা মাশুলে পার হতে পারবে। এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাহাজের ধারণক্ষমতার প্রতি টনের জন্য প্রতিবার ১ ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ১৪ মার্কিন সেন্ট মাশুল নেওয়া হবে। এই পরীক্ষামূলক হার ২০৩১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকার কথা।
খালের আরেকটি সুবিধা হলো নদীপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে কুইনঝৌ সমুদ্রবন্দরের জেটিতে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ। মাঝপথে পণ্য অন্য জাহাজে স্থানান্তরের প্রয়োজন হবে না। ফলে নদী থেকে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের প্রক্রিয়া আরও নির্বিঘ্ন হবে।
প্রকল্পের আড়ালে বড় মানবিক মূল্য
তবে এত বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে একটি বড় মানবিক ও সামাজিক দিকও জড়িয়ে রয়েছে। খাল নির্মাণের জন্য হাজার হাজার পরিবারকে নিজেদের বসতভিটা ও জমি ছেড়ে অন্যত্র যেতে হয়েছে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, গুয়াংসির চারটি কাউন্টি ও কাউন্টি-সমপর্যায়ের শহর মিলিয়ে ২ হাজার ৭৬৪টি পরিবারের ১১ হাজার ২২৮ জনকে পুনর্বাসন করতে হয়েছে।
শুধু হেংঝৌ এলাকাতেই ৩৬৮টি পরিবারের বাড়ি সরিয়ে নেওয়ার চুক্তি হয়। মোট ৮৪ হাজার ২০০ বর্গমিটার এলাকা থেকে এসব স্থাপনা পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয় এবং ১ হাজার ২২১ জনকে সাময়িকভাবে পুনর্বাসন করা হয়।
পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণের ওপর নির্ভর করা হয়নি। স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২১ ধরনের বাড়ির নকশা তৈরি করা হয়। এসব নকশায় বসার ঘরের দিক, ফসল শুকানোর স্থান, হাঁস-মুরগি পালনের জায়গা এবং কৃষি রাসায়নিক রাখার ঘরের মতো বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
পুনর্বাসন প্রকল্পের সবচেয়ে বড় শহর শাপিংয়ে বাসিন্দাদের চারতলা বাড়ি দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বাড়ির আয়তন প্রায় ৪২০ বর্গমিটার। কিছু বাড়ির নিচতলায় রাস্তার দিকে বাণিজ্যিক দোকানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে নতুন সুযোগ-সুবিধা পেলেও অনেক বাসিন্দার মধ্যে পুরোনো গ্রাম ও বসতভিটা হারানোর বেদনা রয়েছে।
শিনফু এলাকায় একসময় ফেংহুয়াংপিং নামে একটি গ্রাম ছিল। সেখানকার এক বাসিন্দার ভাষায়, এখন আর ফেংহুয়াংপিং নামে কোনও গ্রাম নেই, তবে পিংলু খালের কারণে ভবিষ্যৎ আরও ভালো হবে—এমন আশা রয়েছে।
কিছু পরিবার নিজেদের নতুন বাড়িতে শত শত বছরের পুরোনো গাছও নিয়ে গেছে। এর মধ্যে একটি কর্পূরগাছের বয়স ২১৭ বছর বলে জানা গেছে।
পুনর্বাসনের পুরো প্রক্রিয়া ৩৯ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়। এর সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের নির্মাণ প্রকল্পে কর্মসংস্থান এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
ভূগোল যখন বাণিজ্যের নিরাপত্তা নির্ধারণ করে
পিংলু খালের গুরুত্ব শুধু পরিবহন ব্যয় কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা এবং বিকল্প সরবরাহপথ তৈরির বৃহত্তর কৌশলও জড়িত।
বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রণালি ও সমুদ্রপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান ধমনি হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে এসব পথ সংকটের সময় বড় ধরনের দুর্বলতার জায়গাতেও পরিণত হতে পারে। হরমুজ প্রণালির সাম্প্রতিক সংকট তার একটি উদাহরণ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ যে জলপথ দিয়ে যায়, সেখানে সংঘাত বা নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে বিকল্প পরিবহনপথ ও নতুন সরবরাহব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
এই বাস্তবতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পাইপলাইন, মজুত ব্যবস্থা, রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং বিকল্প বাণিজ্য করিডর তৈরির দিকে ঝুঁকছে। লক্ষ্য এক বা দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
পিংলু খালও চীনের সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের শিল্প ও উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে সমুদ্রের সঙ্গে আরও সংক্ষিপ্ত পথে যুক্ত করবে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পণ্য পৌঁছানোর একটি বিকল্প ও তুলনামূলক দ্রুত পথ তৈরি করবে। অর্থাৎ, পিংলু খাল শুধু একটি নতুন জলপথ নয়; এটি চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল, সমুদ্রবন্দর, শিল্প, সরবরাহব্যবস্থা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারকে একই বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার একটি বড় অবকাঠামোগত উদ্যোগ। সূত্র: আল-জাজিরা