✕


হুতির দাপটে অস্থির তেলের বাজার, বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-১৪, | ১৭:২৫:৫২ |

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০৮ ডলার অতিক্রম করেছে। সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ ক্রুড পাইপলাইনে একের পর এক ড্রোন হামলার পর কর্তৃপক্ষ সেটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে এই তীব্র ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়। সোমবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৩.২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ ১০৮.০৩ ডলারে গিয়ে পৌঁছায়।

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে একাধিক হামলা চালানোর পাশাপাশি বাব আল-মানদাব প্রণালির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘পেরিম’ দ্বীপ দখল করে নেওয়ার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দ্বীপটি দখলের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তার করেছে গোষ্ঠীটি। এদিকে, বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ যে প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালিতে একটি সাময়িক নৌ-চলাচল লেন তৈরির বিষয়ে তেহরানের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করেছে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো। এই সিদ্ধান্তের পর বাজারের উৎকণ্ঠা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। সৌদি আরবের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যদি ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি পুনরায় চালু করা না যায়, তবে দেশটির তেল রপ্তানির মজুত পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে।

তেলের পাশাপাশি লাফিয়ে বেড়েছে গ্যাসের দামও। সোমবার যুক্তরাজ্যে গ্যাসের বেঞ্চমার্ক মূল্য ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি থার্ম ২০৮.৭৩ পেন্সে গিয়ে ঠেকেছে, যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ।

চলতি বছর জুড়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে পুরো অঞ্চল জুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে চলেছে। এর আগে গত এপ্রিল মাসে তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছিল, তবে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আশায় দাম কিছুটা কমে আসে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী সমঝোতা স্মারক ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে জ্বালানির বাজার আবারও উত্তপ্ত হতে শুরু করে। সহিংসতা নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করায় গত সপ্তাহেই অপরিশোধিত তেলের দাম জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো আবারও ১০০ ডলারের কোঠা পার করে।

বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান 'আইজি'-র শীর্ষ বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করে বলেছেন, বাজার এখন আবার গত বসন্তের সেই সর্বোচ্চ মূল্যের দিকেই ফিরে যাচ্ছে। তার মতে, জ্বালানি খাতের ওপর হামলা, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু করার প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিগুলো তৈরি হয়ে তেলের বাজারকে তার সবচেয়ে বড় আশঙ্কার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশৃঙ্খলা কেবল পারস্য উপসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হুতির নতুন করে হামলার হুমকি মূল জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথগুলোকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এত কিছুর পরও বাজার এখন পর্যন্ত যে তুলনামূলক শান্ত রয়েছে সেটাই বড় বিস্ময়ের বিষয় কিন্তু মার্চ মাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড যদি মূল্যের ক্ষেত্রে ভেঙে যায়, তবে সার্বিক পরিস্থিতি খুব দ্রুতই বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে।

সৌদি আরবের শীর্ষ পাইপলাইনে ড্রোন হামলার আগেই দেশটির তেল উৎপাদনে বড় ধরনের ভাটা পড়েছিল। ব্লুমবার্গের তথ্যানুযায়ী, রিয়াদ সম্প্রতি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেক-কে জানিয়েছে, গেল আগস্ট মাসে তাদের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ১৯৯০ সালের পর সর্বনিম্নে নেমে এসেছিল।

জ্বালানি তেলের এই অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি ইতোমধ্যেই বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিগুলোতে মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যখন তাদের নতুন সুদের হার নির্ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই জ্বালানির এই নতুন ঊর্ধ্বগতি ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় তাদের সামনে এক কঠিন নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..