✕


অস্ট্রিয়ায় ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের হিজাব নিষিদ্ধ, নতুন আইন কার্যকর

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-১২, | ১২:০২:২৬ |

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রিয়ায় ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের স্কুলে হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। দেশটির সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের স্কুলেই মুসলিম মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী মাথা ঢাকার পোশাক, বিশেষ করে হিজাব ও বোরকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নতুন আইনটি নিয়ে অস্ট্রিয়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের অধিকার সুরক্ষার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হলেও দেশটির মুসলিম সংগঠন ও বিরোধীদের একাংশ বলছে, এই আইন মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বাড়াতে পারে এবং সাংবিধানিক প্রশ্নও তৈরি করতে পারে।

রক্ষণশীল পিপলস পার্টি (ওভিপি)-এর ইন্টিগ্রেশনমন্ত্রী ক্লডিয়া বাউয়ার হিজাবকে ‘নিপীড়নের প্রতীক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, অল্প বয়স থেকেই মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করার একটি মাধ্যম হিসেবে হিজাব ব্যবহার করা হয়। সরকারের মতে, নতুন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য কোনও ধর্মকে আঘাত করা নয়; বরং শিশুদের স্বাধীনতা ও লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করা।

রক্ষণশীল নেতৃত্বাধীন তিন মধ্যপন্থী দলের জোট সরকার—ওভিপি, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস (এসপিও) এবং উদারপন্থী নেওস—এই আইনটি প্রণয়ন করেছে। জোট সরকারের দাবি, এটি ‘লিঙ্গসমতার প্রতি স্পষ্ট অঙ্গীকার’ এবং এর মাধ্যমে অল্পবয়সী মেয়েদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করা হবে।

তবে দেশটির সরকারি ইসলামিক সংগঠন অস্ট্রিয়ায় ইসলামি ধর্মীয় সম্প্রদায় (আইজিজিও) নতুন আইনের তীব্র বিরোধিতা করেছে।

সংগঠনটির প্রতিনিধি কার্লা আমিনা বাগহাজাতি বিবিসিকে বলেন, মুসলিম মেয়েদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা মৌলিক ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারে অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ এবং এর প্রভাব মুসলিম মেয়েদের ওপর অসমভাবে পড়বে।

তার মতে, শিশুদের সুরক্ষার পরিবর্তে আইনটি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় চর্চাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। এর ফলে যেসব শিশুকে সহায়তা করার কথা বলা হচ্ছে, তারাই বরং সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

আইজিজিও জানিয়েছে, যেসব মেয়ে ও তাদের পরিবার মনে করবে যে নতুন আইনের মাধ্যমে তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তারা আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ জানালে সংগঠনটি তাদের পাশে থাকবে। প্রয়োজন হলে এসব মামলা অস্ট্রিয়ার সাংবিধানিক আদালত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়তা করবে তারা।

আগের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছিল আদালত
অস্ট্রিয়ায় স্কুলে মুসলিম মেয়েদের মাথা ঢাকার পোশাক নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। এর আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হিজাব নিষিদ্ধ করে একটি আইন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালে দেশটির সাংবিধানিক আদালত সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে দেয়।

আদালতের যুক্তি ছিল, ওই নিষেধাজ্ঞা অস্ট্রিয়ার ধর্মীয় নিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে নতুন আইনটি কার্যকর হওয়ার পর এটি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলে কী ধরনের আইনি পরিণতি হয়, সেদিকেও নজর রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করবেন শিক্ষকরা
নতুন আইন বাস্তবায়নের দায়িত্বের একটি বড় অংশ পড়েছে শিক্ষকদের ওপর। কোনও শিক্ষার্থীকে স্কুলে হিজাব পরা অবস্থায় দেখা গেলে শিক্ষককে প্রথমে ওই শিক্ষার্থী এবং তার আইনগত অভিভাবকের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করতে হবে।

তবে নিষেধাজ্ঞা বারবার অমান্য করা হলে বিষয়টি শিশু সেবা বিভাগের কাছে জানাতে হবে। শেষ পর্যন্ত অভিভাবকদের সর্বোচ্চ ৮০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।

এই দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের একটি অংশ মনে করছে, স্কুলের শিক্ষাদান ও অন্যান্য দায়িত্বের পাশাপাশি পোশাকসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার দায়িত্ব তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

গ্রিন পার্টির নেতা সিগি মাউরার শিক্ষা মন্ত্রী ক্রিস্টফ ভিডারকিয়ারের সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি নতুন করে সংঘাত সৃষ্টি করছেন এবং সেই সংঘাতের দায় শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।

মাউরারের অভিযোগ, শিক্ষকরা এমনিতেই প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছেন। এর মধ্যে তাদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে কার্যত পুলিশ কর্মকর্তার মতো ভূমিকা পালনে বাধ্য করা হচ্ছে।

আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার দাবি ডানপন্থীদের
অন্যদিকে, বিরোধী ডানপন্থী ফ্রিডম পার্টি (এফপিও) বর্তমান নিষেধাজ্ঞাকে যথেষ্ট কঠোর মনে করছে না। দলটি স্কুলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক—উভয়ের ক্ষেত্রেই হিজাব ও মুখঢাকা পোশাকের ওপর সাধারণ নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছে।

এফপিও-এর রিকার্ডা বার্গার বলেছেন, অস্ট্রিয়ায় ‘রাজনৈতিক ইসলামের কোনও স্থান নেই’, বিশেষ করে দেশটির স্কুলগুলোতে এর কোনও জায়গা থাকা উচিত নয়।

ওভিপি নেতা ও অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ক্রিশ্চিয়ান স্টকারও সম্প্রতি ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-এর ওপর সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দিয়েছেন। অস্ট্রিয়ার সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ওআরএফ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি ‘ইসলামিক রাষ্ট্রে বসবাস করতে চান না’।

ফ্রান্সের সঙ্গে পার্থক্য
ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই মুসলিম নারীদের পোশাক নিয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। ফ্রান্সে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্কুলে হিজাব, পাগড়ি ও কিপ্পার মতো দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

তবে অস্ট্রিয়ার নতুন আইনের সঙ্গে ফ্রান্সের আইনের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফ্রান্সের আইন সব ধরনের দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও অস্ট্রিয়ার নতুন আইনটি বিশেষভাবে মুসলিম মেয়েদের মাথা ঢাকার পোশাককে লক্ষ্য করে প্রণয়ন করা হয়েছে।

অস্ট্রিয়াসহ ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও ডেনমার্কের মতো ইউরোপের কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে জনসমক্ষে পুরো মুখ ঢেকে রাখে এমন নিকাব বা বোরকার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

মুসলিম সংগঠনের উদ্বেগ
অস্ট্রিয়ার ইসলামিক সংগঠন আইজিজিও বলছে, ইউরোপজুড়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে জটিল সামাজিক সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে প্রতীকী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বাগহাজাতির মতে, এ ধরনের উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক মনোযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সমস্যার মূল কারণ সমাধানে খুব কমই কার্যকর হয়।

নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর এখন এর বাস্তব প্রয়োগ, মুসলিম পরিবারগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং সম্ভাব্য সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের দিকে নজর থাকবে। একই সঙ্গে স্কুলে ধর্মীয় স্বাধীনতা, শিশুদের অধিকার ও লিঙ্গসমতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এ প্রশ্নও অস্ট্রিয়ার রাজনৈতিক বিতর্কে আরও জোরালো হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..