সর্বশেষ :
মঙ্গলবার থেকে ঢাকার সড়কে নামছে ‘পিংক বাস’ , চালক-কন্ডাক্টর নারী মানসিক চাপে থাকা নাবিকদের নিয়ে দেশে ফিরছে সেই মার্কিন রণতরী বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর শীর্ষ কমান্ডার নিহত বায়ুদূষণে আজ শীর্ষে দুবাই, ঢাকার অবস্থান ‘সহনীয়’ কোটি টাকার লিগ ছেড়েও ভরাডুবি, তবে কি অনিচ্ছায় সিরিজ খেলছে অস্ট্রেলিয়া? তিন দিনেই ১০০ কোটি পার, ইমরান হাশমির ‘আওয়ারাপান টু’র ঝড় হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার ঘোষণা ট্রাম্পের, আদৌ কি তা সম্ভব? আবুল কালাম আযাদের আপিল চলবে কিনা শুনানি ৩১ আগস্ট ক্রিকবাজের প্রতিবেদন: অস্ট্রেলিয়ায় ভয়কে জয় করেছে বাংলাদেশ

টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন

সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের পাল্টা কি ইসরায়েল-ভারত জোট?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৭, | ১০:৫৩:৫৭ |

উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা পাকিস্তানের বহুদিনের। ১৯৫০-এর দশক থেকেই দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। এবার সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘদিনের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ইসলামাবাদ।

তবে চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর থেকেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক কি পাকিস্তানের দুর্বল অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার পথ খুলে দেবে? তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি কি আরও বড় পরিসরে পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডারে যুক্ত হবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- এই চুক্তির মধ্য দিয়ে কি মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন শক্তিবলয়ের জন্ম হচ্ছে?
মক্কা চুক্তিকে দেখার অন্তত দুটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

‘মুসলিম ন্যাটো’ নয়
সন্দেহবাদীদের মতে, চুক্তিটির বাস্তব সামরিক গুরুত্ব হয়তো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। কারণ সাধারণত একটি কার্যকর সামরিক জোটের ভিত্তিতে থাকে অভিন্ন শত্রু। কিন্তু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের অভিন্ন কোনও শত্রু নেই।

ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানি মনে করেন, তিন দেশের শত্রু ও কৌশলগত স্বার্থ এক নয়। তার মতে, এটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটের চেয়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথভাবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের সুযোগ বাড়তে পারে। কিন্তু একে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলা ঠিক হবে না।

হাক্কানির ভাষায়, চুক্তিটি বাস্তবের চেয়ে প্রতীকী গুরুত্বই বেশি বহন করে।

তবে অন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে। চুক্তিতে তিন দেশ কী পাচ্ছে না, সেটির দিকে না তাকিয়ে তারা কী নিয়ে আসছে, সেটি দেখলে এর সম্ভাব্য গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।

সৌদির হাতে অর্থ, তুরস্কের হাতে প্রযুক্তি
সৌদি আরব এই জোটে নিয়ে আসছে বিপুল আর্থিক সক্ষমতা। দেশটির বিশাল তেলসম্পদ সামরিক ব্যয় বাড়ানো এবং মিত্রদের আর্থিকভাবে সহায়তা করার সামর্থ্য তৈরি করেছে।

তুরস্ক নিয়ে আসছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ- সামরিক দক্ষতা ও দ্রুত বিকশিত প্রতিরক্ষা শিল্প।

ন্যাটো সদস্য তুরস্ক গত কয়েক বছরে নিজস্ব অস্ত্রশিল্পকে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করেছে। দেশটির তৈরি বিভিন্ন অস্ত্র এখন বিশ্বের নানা দেশে রফতানি হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে তুরস্কের তৈরি বায়রাকতার টিবি২ ড্রোন বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ অগ্রযাত্রা ঠেকাতে এসব ড্রোন ব্যবহার করে এবং আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বও সামনে আসে।

অন্যদিকে পাকিস্তান এই অংশীদারিত্বে এমন একটি সক্ষমতা নিয়ে আসছে, যা সৌদি আরব ও তুরস্কের নেই- বড় ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে পারমাণবিক অস্ত্র।

এই পারমাণবিক সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত জোটে পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হয়ে উঠতে পারে। সৌদি আরব দিতে পারে অর্থ, তুরস্ক দিতে পারে প্রযুক্তি ও সামরিক দক্ষতা; আর পাকিস্তান দিতে পারে কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতা। এই ‘পরমাণু ছাতা’ই তিন দেশের জোটকে এমন একটি কৌশলগত ওজন দিতে পারে, যা সৌদি আরব বা তুরস্ক এককভাবে অর্জন করতে পারবে না।

একজনের ওপর হামলা মানে তিনজনের ওপর?
চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনও একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তবে বাস্তবে এই প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ তিন দেশের কৌশলগত স্বার্থ এক নয়। অন্য একটি দেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগে প্রত্যেক দেশকেই সম্ভাব্য বিপুল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

তারপরও সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে একে অপরকে সামরিক সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য, রসদ, প্রশিক্ষণ কিংবা অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই জোটে তুরস্কের ভূমিকা ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সময় তুরস্কের সামরিক কর্মকর্তারা পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন এবং আঙ্কারা পাকিস্তানকে বায়রাকতার টিবি২সহ শত শত ড্রোন সরবরাহ করেছে।

ভারতের তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের ডিফেন্স ফেলোশিপের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার অনিল রমন মনে করেন, জোটে তুরস্কের সামরিক ভূমিকার সম্ভাব্য প্রভাবকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

তার মতে, তুরস্ক ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও উন্নত ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম তৈরির অন্যতম শীর্ষ দেশ। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকেও দেশটি বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত তুর্কি অস্ত্র ও সামরিক দক্ষতা আরও বেশি করে পাকিস্তানে প্রবাহিত হতে পারে।

এর ফলে পাকিস্তানের সামরিক আধুনিকায়নে তুরস্কের সম্পৃক্ততা আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সৌদি আরব নিয়ে ভারতের হিসাব আরও জটিল
তুরস্কের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে, সৌদি আরবের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। কারণ রিয়াদের ভারত ও পাকিস্তান- দুই দেশের সঙ্গেই গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িত।

ভারতে সৌদি আরবের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। জ্বালানি থেকে প্রযুক্তি- বিভিন্ন খাতে দেশটি ভারতে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এমনকি প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।

অন্যদিকে ভারত সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ক্রেতা। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক। এর পাশাপাশি সৌদি আরবে প্রায় ৪০ লাখ ভারতীয় বসবাস ও কাজ করেন।

ফলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনও বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হলে সৌদি আরবকে অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

ভারতের সামরিক পরিকল্পনাবিদদের আশঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তান- দুই দেশের সঙ্গেই সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান স্বার্থ ভবিষ্যৎ সংকটে ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। রিয়াদ হয়তো কোনও পক্ষকে সরাসরি সমর্থন না করে দ্রুত সংঘাত থামানোর উদ্যোগ নেবে।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার অনিল রমনের মতে, সৌদি আরবের একটি বড় উদ্বেগ হবে পাকিস্তান যেন বড় ধরনের সামরিক পরাজয়ের মুখে না পড়ে। একই সঙ্গে ভারতে তাদের বড় বিনিয়োগ থাকায় নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কও তারা ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইবে না।

উপসাগরে ভারতের তৎপরতা কেন বাড়ছে?
এই ভারসাম্যের বিষয়টিই সম্ভবত ব্যাখ্যা করে কেন ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের দিকে এত ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে।

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল গত ছয় মাসে তিনবার সৌদি আরব সফর করেছেন। এসব সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। তবে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি আলোচনার বাইরে ছিল—এমনটা মনে করা কঠিন।

এখানেই মক্কা চুক্তিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় রহস্য সামনে আসে—আসলে এই জোট কাকে লক্ষ্য করে গঠিত?

লক্ষ্য কি ভারত, ইরান নাকি ইসরায়েল?
ভারতকে এই জোটের সরাসরি লক্ষ্য হিসেবে দেখার কারণ নেই। তবে কৌশলগতভাবে নয়াদিল্লি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সংঘাতে পারমাণবিক অস্ত্রের তেমন কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই। ইরানও সম্ভাব্য একটি লক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তান- তিন দেশের কেউই তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে খুব বেশি আগ্রহী বলে মনে হয় না।

এ কারণে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক বিশ্লেষক মনে করছেন, মক্কা চুক্তিকে নির্দিষ্ট কোনও শত্রুর বিরুদ্ধে জোট হিসেবে দেখার চেয়ে পরিবর্তিত মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস চুক্তিটিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতা হারানোর আশঙ্কার বিরুদ্ধে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের’ একটি নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত অনেক আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকও। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে আগ্রহী বা সক্ষম কি না- এ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খল প্রত্যাহার এবং ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত অগ্রাধিকার উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে উৎসাহিত করেছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে মক্কা চুক্তি যুদ্ধের প্রস্তুতির চেয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইসরায়েলকে ঘিরেও নতুন সমীকরণ?
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এই জোটের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী উপাদানও রয়েছে। গাজা যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং ইসরায়েল-তুরস্কের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত হিসাব বদলে দিয়েছে।

অনিল রমনের মতে, এটি শুধু ইরানবিরোধী জোট নয়; বরং এর মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী প্রবণতাও রয়েছে এবং এর ফলে ইসরায়েলের নিরাপত্তায় গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।

এখান থেকে আরও স্পর্শকাতর একটি প্রশ্ন সামনে আসে- ভবিষ্যতে পাকিস্তান কি তার পারমাণবিক প্রযুক্তির কোনও অংশ অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করতে পারে?

এমন কোনও কর্মকাণ্ডের প্রমাণ নেই। তবে কিছু কৌশলবিদ মনে করেন, সম্ভাবনাটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের বিরোধ আরও গভীর হলে আঙ্কারা ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে- এমন জল্পনাও রয়েছে।

তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তুরস্ক বা সৌদি আরবকে পারমাণবিক অস্ত্র বা প্রযুক্তি সরবরাহের কোনও প্রমাণ এখন পর্যন্ত নেই।

তিন দেশের জোটে কি যোগ দেবে মিসর?
মক্কা চুক্তি তিন দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মিসর শিগগিরই এই জোটে যোগ দিতে পারে।

মিসর যুক্ত হলে জোটটির সামরিক সক্ষমতা ও ভৌগোলিক পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তি মিসর। দেশটি যুক্ত হলে জোটের প্রভাব ভূমধ্যসাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

ভারতও কি পাল্টা জোট গড়ছে?
নতুন এই জোট গড়ে ওঠার সময় ভারতও বসে নেই। সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী ও ‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিকস’ পডকাস্টের সহ-উপস্থাপক ররি স্টুয়ার্টের মতে, নীরবে একটি পাল্টা কৌশলগত সমীকরণও গড়ে উঠতে পারে। তিনি ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস ও সাইপ্রাসের মধ্যে বাড়তে থাকা সহযোগিতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

ভারতীয় কর্মকর্তারা অবশ্য কোনও আনুষ্ঠানিক জোট গড়ে ওঠার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২০২৩ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গ্রিস সফর করেন। চার দশকের মধ্যে এটি ছিল কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম গ্রিস সফর। ওই সফরে দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করে। চলতি বছরের শুরুতে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিস আবারও মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জুনে মোদি সাইপ্রাস সফর করেন।

ইউরোপ ও ভারতের মধ্যে প্রস্তাবিত ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর বা আইএমইসির ক্ষেত্রেও গ্রিস ও সাইপ্রাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে ভারতের সঙ্গে দেশ দুটির সম্পর্ক জোরদারের পেছনে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত- দুই ধরনের হিসাবই কাজ করছে।

আলাদাভাবে দেখলে এসব উদ্যোগকে স্বাভাবিক কূটনৈতিক তৎপরতা মনে হতে পারে। কিন্তু সবগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, সৌদি আরবের মতো ভারতও দ্রুত পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে।

‘মুসলিম ন্যাটো’ না হলেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়তো কোনও ‘মুসলিম ন্যাটো’র জন্ম দিচ্ছে না। তিন দেশের কৌশলগত স্বার্থের পার্থক্য, অভিন্ন শত্রুর অনুপস্থিতি এবং যুদ্ধে একে অপরের হয়ে সরাসরি অংশ নেওয়ার বাস্তব ঝুঁকি- সবই এই জোটের সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে।

তবু সৌদি আরবের বিপুল অর্থ, তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের বিশাল সামরিক বাহিনী এবং পারমাণবিক সক্ষমতার সমন্বয়কে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া হবে বড় ভুল।

এই সমীকরণ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু এটি যদি আরও বিস্তৃত হয় এবং মিসরের মতো দেশ এতে যুক্ত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় এর প্রভাব যথেষ্ট বড় হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই জোটের বিকাশ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা, তুরস্কের অস্ত্র ও প্রযুক্তির প্রভাব এবং সৌদি আরবের কৌশলগত ভারসাম্য- তিনটিকেই নতুন বাস্তবতায় নিয়ে আসতে পারে।

তাই মক্কা চুক্তিকে কেবল একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি হিসেবে দেখলে এর দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য হয়তো ধরা পড়বে না। বরং এটি এমন এক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল শক্তির ভারসাম্যের প্রতিফলন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের জন্য নতুন বিকল্প তৈরি করতে চাইছে একাধিক দেশ। সূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..