পহেলা বৈশাখের রঙ কেন লাল-সাদা?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-১৩, | ১৭:৪০:৪২ |
‘নববর্ষ’ বাঙালির সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা রীতি, ঐতিহ্য আর ইতিহাস। শোভাযাত্রা থেকে শুরু করে পান্তা ইলিশ- এ উৎসব ঘিরে সবকিছুতেই রয়েছে বিশেষত্ব। তেমনই একটি বিশেষ অধ্যায় হলো ‘রঙ’। সাদা শাড়ির ভাঁজে লাল পাড়, পাঞ্জাবির সাদার ওপর লাল নকশা, আলপনায় সাদা মাটির ওপর লালের উচ্ছ্বাস। এ লাল-সাদা রঙ ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ বাঙালির এ উৎসব। কিন্তু লাল-সাদার গল্প কী কেবল নান্দনিকতার? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে বহু শতকের ইতিহাস, অভ্যাস, আর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক সাংস্কৃতিক চেতনা?

এ গল্পের শুরু উৎসবে নয়, বরং হিসাবের খাতায়। ষোড়শ শতকে মোঘল সম্রাট আকবর যখন কৃষি ও খাজনা ব্যবস্থাকে সহজ করতে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন, তখন পহেলা বৈশাখ ছিল মূলত প্রশাসনিক একটি দিন। সেই সময় ব্যবসায়ীরা খুলতেন নতুন খাতা, যার নাম ‘হালখাতা।‘ এ খাতাগুলোর একটি খুব নির্দিষ্ট রূপ ছিল, বাইরে লাল মলাট, ভেতরে সাদা পৃষ্ঠা। লালকে মনে করা হত সূচনার শুভ সংকেত, আর সাদা, একেবারে ফাঁকা, নতুন হিসাবের প্রতীক। তখনও কেউ ভাবেনি, এ খাতার রঙ একদিন পুরো একটি জাতির উৎসবের রঙ হয়ে উঠবে।

গ্রামের বাংলায় এ রঙের আরেকটি নীরব ইতিহাস গড়ে উঠছিল। একসময় মানুষের পরনের কাপড় ছিল সাদা, কারণ সুতির কাপড়ের স্বাভাবিক রঙই ছিল অফ-হোয়াইট, আর সেটিই ছিল সবচেয়ে সহজলভ্য। কিন্তু উৎসবের দিনগুলোয় সেই সাদার ওপর পাড়ে, নকশায় একটু লাল যোগ করত বিশেষত্ব। লাল রঙ তুলনামূলক সহজে পাওয়া যেত প্রাকৃতিক উৎস থেকে, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শুভ, আনন্দ আর প্রাণের ধারণা। ধীরে ধীরে “সাদা কাপড়ে লাল পাড়” হয়ে উঠল উৎসবের চেনা চিত্র।

এ চিত্রকে আরো গভীর করে তুলেছিল বাংলার প্রকৃতি নিজেই। বৈশাখ মানেই রুক্ষ, ধুলোমাখা, প্রখর রোদে ফিকে হয়ে যাওয়া এক প্রান্তর একটি প্রায় সাদা পৃথিবী। সেই শুষ্কতার মাঝেই হঠাৎ জ্বলে ওঠে আগুনের মতো ফুল কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ। প্রকৃতি যেন নিজেই আঁকে লাল-সাদার এক জীবন্ত ক্যানভাস। মানুষ সেই রঙই পরে, সেই রঙেই সাজায় তার উৎসব। অজান্তেই প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায় এ রঙের সংস্কৃতি। তবু এ রঙ তখনও নিছক অভ্যাস, নিছক সৌন্দর্য। এর গভীর রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অর্থ তখনো গড়ে ওঠেনি। সেই অর্থ তৈরি হয় অনেক পরে, বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে।

পাকিস্তান আমলে, যখন বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল, তখন পহেলা বৈশাখ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে প্রতিরোধের এক নীরব মঞ্চ। এ উৎসব আর শুধু নতুন বছরের আনন্দ নয়, হয়ে ওঠে পরিচয়ের ঘোষণা। সেই সময়ে শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, ছাত্ররা বিশেষ করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীরা একটি দৃশ্যমান ভাষা তৈরি করতে চাইলেন, যা হবে ধর্মনিরপেক্ষ, সহজবোধ্য, এবং সবার জন্য গ্রহণযোগ্য। লাল ও সাদা তখন আর কেবল কাপড়ের রঙ নয়, এ হয়ে ওঠে একটি জাতির দৃশ্যমান পরিচয়।

এভাবে ধীরে ধীরে লাল-সাদা একটি নান্দনিক অভ্যাস থেকে রূপ নেয় একটি সাংস্কৃতিক প্রতীকে। সাদা হয়ে ওঠে নতুন শুরুর ‘শূন্য ক্যানভাস’, যেখানে এখনো কিছু লেখা হয়নি। আর লাল হয়ে ওঠে জীবনের স্পন্দন-আনন্দ, উচ্ছ্বাস, শক্তি, আর কখনো কখনো প্রতিরোধের আগুন।

আজ যখন পহেলা বৈশাখের সকালে মানুষ লাল-সাদা পরে রাস্তায় নামে, তখন তারা হয়তো এই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিটি স্তর সচেতনভাবে মনে রাখে না। কিন্তু তাদের পোশাক, তাদের রঙ, অজান্তেই বহন করে নিয়ে চলে সেই ইতিহাস। একটি খাতার লাল মলাট, একটি সাদা পৃষ্ঠার শূন্যতা, গ্রামের সরল বস্ত্র, প্রকৃতির আগুন-রঙা ফুল, আর এক সময়ের সাংস্কৃতিক সংগ্রাম-সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে এ দুই রঙের গভীর সম্পর্ক।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..