✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-১০, | ১২:৫৩:০৯ |কয়েক দিন আগেই ইরানের কট্টরপন্থিরা তেহরানে বড় এক ব্যানার ঝুলিয়ে দেয়, তাতে লেখা হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে। পুরো পদক্ষেপটিই ইরানের শীর্ষ নেতা মোজতবা খামেনির নির্দেশে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তিনি গত মাসে নেতা নির্বাচিত হন এবং তাকে এখন পর্যন্ত কেউ প্রকাশ্যে দেখেননি।
তবে ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার পর ওই ব্যানারটি নামিয়ে ফেলা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধবিরতিতে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেছে পাকিস্তান। দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।
ইরান বারবারই বলছে, তারা সাময়িক যুদ্ধবিরতি মানবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে স্থায়ী সমাধান চায়। ইরানের কট্টরপন্থিরাও এ যুদ্ধবিরতি নিয়ে সন্তুষ্ট নন। তাদের কথা, এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখতে পেরেছে এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে চাপে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধে এই এগিয়ে থাকার বিষয়টির কারণে সংঘাত অব্যাহত রাখা উচিত।
একাধিক গণমাধ্যমের খবর বলছে, গত মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর তেহরানে কট্টরপন্থিরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকা পুড়িয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রিত বাসিজ মিলিশিয়ার একটি দল মধ্যরাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হাজির হয়ে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদও জানিয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের কট্টরপন্থি সংবাদপত্র কায়হানের সম্পাদক লেখেন, যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়া আসলে ‘শত্রুকে উপহার দেওয়ার মতো’। এতে অপর পক্ষ আবার নিজেদের ভান্ডার পূরণ ও যুদ্ধ শুরু করার সুযোগ পাবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও তার সামরিক প্রধান আসিম মুনিরের কাছ থেকে আসা অনুরোধের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেছে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এসএনএসসি)। এটি দেশের শীর্ষ নেতার অধীনে পরিচালিত সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামো। বর্তমানে এর দায়িত্বে রয়েছেন মধ্যমপন্থি হিসেবে পরিচিত মাসুদ পেজেশকিয়ান।
এসএনএসসি এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে দুই সপ্তাহ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে জাহাজ যাতায়াত করতে পারবে এবং এ সময়টিতে ওয়াশিংটন ও তেহরান আলোচনায় বসবে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, ইরানকে পাকিস্তানের প্রস্তাবে রাজি করাতে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তান চীনের দীর্ঘদিনের মিত্র। ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, তিন হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন দেশটিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও ক্ষয়ক্ষতি ও বড় মাপে ধ্বংস সাধনের হুমকি দিয়েছিলেন। পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছিল, তাতে কট্টরপন্থিদের মধ্যেও এটি স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলো আরও ধ্বংস হওয়ার আগেই কোনো একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে।
এর প্রমাণ মেলে ইরানের কট্টরপন্থি প্রধান বিচারপতি গোলামহোসেন মোহসেনি এজেইয়ের বক্তব্যে। যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান যুদ্ধে এগিয়ে থেকে সংঘাত অবসানের একটি পথ খুঁজছে। একই ধরনের কথা কয়েক দিন আগে বলেছিলেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জাফরিও। তিনি এ বিষয়ে এক নিবন্ধ লিখেছিলেন ইউএস পাবলিকেশন ফরেন অ্যাফেয়ার্সে।
এসএনএসসি যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ইরানের জন্য বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছে। শাসকশ্রেণির সমর্থকদেরও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছে তারা। ইরানের গণমাধ্যমের তথ্যানুসারে, দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া দলের নেতৃত্ব দেবেন। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আলোচনায় বসবেন তারা। সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে আলোচনা হবে তাদের।
কট্টরপন্থা থেকে সরে আসার এটিও একটি আভাস। দেশটির সাবেক শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার বিষয়টি নিষিদ্ধ ছিল। এবারের ইরান যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন আলী খামেনি। তবে নতুন পথে হাঁটার নির্দেশটি তার সন্তানের কাছ থেকেই এসেছে।
তবে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র শান্তি থেকে এখনো বেশ দূরে আছে। আলোচনা ব্যর্থ হলে আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। সূত্র: বিবিসি