মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে ঘন কুয়াশা।
ফলে গত মাসে বিশ্বের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে। মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি ও প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি, এ দুইয়ের দোলাচলে পড়ে নীতিনির্ধারকরা এখন অনেকটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। খবর রয়টার্স।
অনিশ্চিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
মার্চে মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, উন্নত ও উদীয়মান উভয় অর্থনীতির দেশগুলোই সুদহারের বিষয়ে রক্ষণশীল ছিল। তেলের বাজারে অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মুদ্রানীতি সহজ করার পথকে জটিল করে তুলেছে।
জেপি মরগান এ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে জানায়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ধাক্কা ঠিক কতটা জোরালো তা বুঝতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আরো সময় লাগবে। তবে প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির দিকেই ঝুঁকে আছে বিশ্ব অর্থনীতি। ব্রিটিশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ডি হালডেন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেন, এ সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে যে গভীর ক্ষত তৈরি করবে, তা গত বছরের শুল্কযুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
উন্নত দেশগুলোর চিত্র
মার্চে উন্নত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূলত আগের অবস্থানেই অনড় ছিল। এসব দেশে অনুষ্ঠিত মোট নয়টি সভার মধ্যে আটটিতেই সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে অস্ট্রেলিয়া সুদহার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছে। এছাড়া কোনো প্রধান উন্নত অর্থনীতিই গত মাসে সুদহার কমায়নি। যদিও এর আগে বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদহার ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারে।
চলতি বছরের এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার দুই দফা বৃদ্ধিতে মোট ৫০ বেসিস পয়েন্টের কঠোর মুদ্রানীতি দেখা গেছে।
উদীয়মান বাজারের প্রবণতা
উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয় কিছুটা বৈচিত্র্য থাকলেও সাবধানতা ছিল স্পষ্ট। মার্চে ১৫টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সভার মধ্যে ১০টি ব্যাংক সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় চারটি দেশ সুদহার সামান্য কমিয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়া ৫০ বেসিস পয়েন্ট এবং ব্রাজিল, মেক্সিকো ও পোল্যান্ড ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে হার কমিয়েছে। তবে কলম্বিয়া নীতি সুদহার বাড়িয়েছে ১০০ বেসিস পয়েন্ট।
ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফিলিপাইন, হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলো জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে অনিশ্চয়তা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করবে এমন আশঙ্কায় সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত বা সীমিত রাখা হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত উদীয়মান বাজারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ১০ ধাপে মোট ৩৭৫ বেসিস পয়েন্ট হার কমিয়েছে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
তবে কলম্বিয়ার দুই দফায় ২০০ বেসিস পয়েন্ট বাড়ায় নিট হিসাবে হ্রাসের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭৫ বেসিস পয়েন্ট।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কর্মসংস্থানের ঝুঁকি ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দেশগুলো। বছরের বাকি সময়জুড়ে অর্থনীতির গতিপথ কেমন হবে, তা বুঝতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ নির্দেশনার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন বিনিয়োগকারী ও আর্থিক বাজার বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, এক দেশের মূল্যস্ফীতি কমার গতি অন্য দেশের চেয়ে আলাদা। ফলে নীতিনির্ধারকদের পক্ষে এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যত দিন থাকবে, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এ সতর্ক অবস্থান তত দিন বজায় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ অ্যান্ডি হালডেন বলেন, গত বছর মূল্যস্ফীতির চাপ কমে আসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার কমিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পেরেছিল। কিন্তু এবার জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সে সুযোগ আর নেই। উল্টো যুক্তরাজ্য, ইউরো অঞ্চল ও যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার বাড়ানোর বা বর্তমান উচ্চ সুদহার বজায় রাখার চাপ তৈরি হয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর..