দেশে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ঈদে, বিশেষ করে ঈদুল ফিতরে মোটরসাইকেল বিক্রি বেড়ে যায়। উৎপাদক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে এ সময় দুই চাকার বাহনটির বিক্রি বাড়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।
যদিও এবারের ঈদ মৌসুমে খারাপ সময় পার করেছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের ধাক্কা লেগেছে মোটরসাইকেলের বাজারে। জ্বালানি সংকটের কারণে ক্রেতাদের একটি বড় অংশ ক্রয় পরিকল্পনা স্থগিত বা বাতিল করায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার ইউনিট মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। আর ঈদের মাসে বিক্রির পরিমাণ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তবে চলতি মার্চে ঈদুল ফিতরের সময়ে মোটরসাইকেলের সামগ্রিক বিক্রি ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত কম হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের বাজারে তেলের প্রাপ্যতা নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাকে মোটরসাইকেল বিক্রি কমার প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত অনেক ক্রেতা তাদের কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন, যার প্রভাব বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বেশি দেখা গেছে। এছাড়া ডলারের মান বাড়ায় আমদানিতে বাড়তি খরচ, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক ভেহিকলের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ প্রথাগত মোটরসাইকেলের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টিভিএস অটোস বাংলাদেশ লিমিটেডের সিইও বিপ্লব কুমার রায় বলেন, ‘বর্তমান জ্বালানি সংকট মোটরসাইকেলের বাজারে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সাধারণত ঈদের সময় মোটরসাইকেলের বাজার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ে। কিন্তু এবারের ঈদে নতুন ক্রেতাদের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন ছিল। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক ক্রেতা তাদের কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে যারা এবার মোটরসাইকেল কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদের মধ্যে ১৫-২০ শতাংশ ক্রেতা বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। তবে যাদের আগে থেকে বুকিং দেয়া ছিল, তাদের সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। মূলত বাজারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ও জ্বালানির নিশ্চয়তা বুঝতে চাওয়ার কারণেই নতুন ক্রেতাদের মধ্যে এ প্রবণতা দেখা গেছে।’
২০২২ সালের পর থেকেই মন্দার মধ্যে রয়েছে দেশের মোটরসাইকেলের বাজার। বাহনটির বিক্রি ও নিবন্ধনে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল। তবে ২০২৫ সালে বাজারটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, গত বছর সারা দেশে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৮৩০টি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১০ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে ২০২৫ সালে দেশে প্রায় সাড়ে চার লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে।
গত বছর মোটরসাইকেল বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি হলেও চলতি বছর জ্বালানি সংকট দেশের মোটরসাইকেলের বাজারকে মন্দার মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি সম্পর্কে বাংলাদেশে রয়্যাল এনফিল্ড মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম এবং মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাহন। বর্তমান জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং সব ক্ষেত্রেই এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। মোটরসাইকেল বিক্রিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে এ জ্বালানি সংকট।’
গতকাল সরজমিন ঢাকার তেজগাঁও, বাংলামোটর ও মগবাজারের বিভিন্ন মোটরসাইকেল শোরুম ঘুরে ব্যবসায়ী ও বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে মোটরসাইকেল বাজারের মন্দা ভাবের বিষয়টি জানা গেছে। শোরুম মালিকরা জানিয়েছেন, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সাধারণত যে পরিমাণ বিক্রির প্রত্যাশা ছিল, জ্বালানি সংকটের কারণে তা পূরণ হয়নি। চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে তেলের প্রাপ্যতা ও দাম নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তায় অনেক ক্রেতা শোরুমে এসেও শেষ পর্যন্ত বাইক কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের মতে, মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্রেতারা জ্বালানি খরচ সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে দ্বিধায় থাকায় ঈদের এ পিক সিজনেও বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।
অবশ্য চলমান জ্বালানি সংকট ক্রেতাদের বিদ্যুচ্চালিত মোটরসাইকেলের দিকে আগ্রহী করে তুলছে বলে জানিয়েছেন রানার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ইঞ্জেকশন কম্বাশন (তেলচালিত) ইঞ্জিনের যানবাহনগুলো রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানি খরচ অনেক কম হওয়ায় ইলেকট্রিক ভেহিকল বা ইভি ক্যাটাগরি বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এমনকি এসব যানবাহন সৌরবিদ্যুৎ দিয়েও চার্জ করা সম্ভব। চলমান এ জ্বালানি সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিসহ সব ধরনের ব্যবসায়িক খাতের ওপর পড়বে।’
এ জাতীয় আরো খবর..